আমাদের গ্রামে
পুঁথি পাঠের আসরে একজন ভাষ্যকার/পন্ডিত থাকেন। ভাষ্যকার অনেকটা দোঁভাষির/অনুবাদকের
কাজ করেন। পড়ুয়া পুঁথির ভাষায় সুর করে পড়েন আর ভাষ্যকার আঞ্চলিক ভাষায় শ্রোতাদের
কাছে তার মর্ম্মার্থ পরিবেশন করেন।... পড়ুয়ার পঠিত অংশের অনুবাদ করতে গিয়ে
ভাষ্যকার বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পঠিত অংশের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
করেন বিচিত্রভাবে।... এভাবেই পুঁথির আসরে শ্রোতারা পুঁথি সাহিত্যের স্বাদ (উপ)ভোগ
করেন।...
আমার বাবা
পুঁথির আসরের একজন ভাষ্যকার ছিলেন। বাড়িতে পুঁথি পাঠের চল্ থাকায় শৈশবেই পুঁথির
আসরের সংস্পর্শ পেয়েছি। কখনো কখনো ছোটোখাটো আসরে ভাষ্যকার হিসাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ
হয়েছে আমারও। তাছাড়া গ্রামে আমার ব্যাক্তিগত পাঠাগারে এমন কিছু আসর জমতো, যেখানে
আমি রবীন্দ্র-নজরুল'র কবিতা পাঠ করে তার মর্মার্থসহ আঞ্চলিক ভাষায় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
করতাম।... গ্রামের অনেক সমবয়সি স্বাক্ষর-নিরক্ষর যুবক তখন আহ্লাদের সাথেই কাব্যের
ভাবসুধা উপভোগ করতো। সেই থেকে সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে আমার এমন এক প্রবণতা গড়ে ওঠে
যে, কোনো টেক্সট পাঠকালে নিজের তথ্যগত অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সংশ্লিষ্ট
সাহিত্যিকের অভিজ্ঞতাকে যত দূর সম্ভব মিলিয়ে না দেখলে সাহিত্যের কোনো রকম স্বাদই
পাই না!
এ কিতাবে
আমি কিছু কবিতা পাঠ ও আমার পঠনরীতি বর্ণনার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন করতে
চেয়েছি।... এটা কিছুতেই সমালোচনাগ্রন্থ নয়; এতে আমি সচেতনভাবেই গতানুগতিক
সমালোচনারীতি থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছি। তবুও কোনো সমালোচনামূলক বক্তব্য যদি
এখানে থেকে থাকে তবে তা আমার বর্ণন সরল করার অভিপ্রায় মাত্র।...
আমার
বিশ্বাস, যে কোনো বিদগ্ধ সাহিত্যিক নিজেই তার রচনার উত্তম সমালোচক।... একজন বিদগ্ধ
সাহিত্যিক তার রচনায় শব্দ, বাক্য, পঙ্ক্তি, চরণ, যতি/ছেদসহ নানান উপাদান চয়নে
বরাবরই সচেতন থাকেন এবং প্রত্যেক শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে তার থাকতে পারে বিশেষ বিশেষ
লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।...
তার মানে
আমি বলতে চাচ্ছি না যে, সাহিত্যের কোনো সমালোচনা হয় না কিংবা সাহিত্যে সমালোচনার
কোনো গুরুত্ব নাই। অবশ্যই সমালোচনাও একপ্রকার সাহিত্য এবং সাহিত্যাঙ্গনে তার
গুরুত্বও বিস্তর। আবার চাইলেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোনো টেক্সটের ‘মিঠেকড়া’
জাতীয় তিক্ত সমালোচনা লেখা সম্ভব। অথবা টেক্সটের সমালোচনা করতে গিয়ে রচয়িতার নামে
আকাস-কুসুম প্রশস্তি রচনাও সম্ভব। প্রচলিত সাহিত্য সমালোচনারীতির কোনো পদ্ধতিতেই
আমার মনষ্কাম সিদ্ধ হওয়ার নয়। তাছাড়া পাঠোদ্ধারের দিকেই আমার ঝোঁক বেশি হওয়ায়
সমালোচনা পদ্ধতি অনুসরণ করে টেক্সটের পুঙ্খানুপুঙ্খ গভীর আলোচনা দুষ্কর বলেই মনে
হয়েছে। তাই আমার পঠনরীতিই আমি সরাসরি বর্ণনের প্রয়াস করেছি। অবশ্যই সমালোচনা
সাহিত্যের মতো এ কাব্যপঠনরীতিকেও আমি সাহিত্যের রূপ দিতে চেয়েছি। কিন্তু তা
সাহিত্যের প্রচলিত শাখা সমুহের সাথে না-ও মিলতে পারে।...
পাঠ(ক) সর্ব্বদা
নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়িই একটি টেক্সটের পাঠোদ্ধারে সক্ষম হন। কাব্য সাহিত্য
এমনিতেই সমাজের মুষ্ঠিমেয় মানুষের সাহিত্য হিসাবে (পরি)গণিত। তার ওপর কাব্যে
ইতিহাস, পুরাণ, অধ্যাত্মিকতা, দর্শন, সমাজ-রাজনীতি ও জগৎ-জীবন জিজ্ঞাসার মতো জটিল
অনুষঙ্গ থাকলে সাধারণ পাঠকের কাছে কাব্যের যথার্থ পাঠোদ্ধার করা দুরহ হয়ে পড়ে (টেক্সটের
আদি ও নিরেট প্রবণতা চিহ্নায়ন তো দূরের কথা...)। অবশ্যই এরূপ সচেতন পাঠকও থাকেন যারা
হয়তো সংশ্লিষ্ট টেক্সটের এমন গভীর পাঠ নিতে সক্ষম হন, রচনাকালে রচয়িতা যার
ধার-কাছও ছুঁতে পারেন না।...
কাব্য যদি
(অনু)ভবের/(উপ)লব্ধির জিনিস হয় তাহলে এর একেবারে সঠিক ব্যাখা-বিশ্লেষণ অসম্ভব।
কিন্তু কাব্যে যে বুঝবার মতো একেবারেই কিছু থাকে না, তা বলা যাবে না। কাব্য যতটা
শিল্প তার চেয়ে বেশি তা ভাপ্রকাশের একটি উচ্চমার্গীয় মাধ্যম। যে সব উপাদানের
সমন্বয়ে কাব্য নির্ম্মিত হয় তার প্রত্যেকের কিছু না কিছু অর্থময়তা থাকে... ফলে
এসব উপাদান নানাভাবে বিশ্লেষণ করলে কোনো না কোনো ভাব অবশ্যই ধরা পড়ে।... তাই বলে
কাব্য পাঠে যে একপ্রকার বোধগম্যতার অতীত আনন্দ/রস আস্বাদন মিলে, এ কথা অস্বীকার
করা চলে না।... মাঝে মধ্যে একধরণের নৈতিকতায় আক্রান্ত হয়ে নিজেই নিজকে প্রশ্নবিদ্ধ
করেছি কবিতার ওপর এমন আলোচনা, সংশ্লিষ্ট কবিতার পাঠের ক্ষেত্রে পাঠকের স্বাধীনতা খর্ব্ব
করবে কী না, এই ভেবে! সাধারণ পাঠ(ক) যে আমার আলোচনা দ্বারা (প্র)ভাবিত হবেন
না, তা হলফ করে বলা যায় না। কিন্তু
একেবারে স্বাধীনতা খর্ব্ব করার অভিযোগ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যে কোনো
সাহিত্য পাঠেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রচয়িতার চিন্তায় পাঠকের আটকা পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
অবশ্যই বিদগ্ধ পাঠ(ক) হলে রচয়িতার চিন্তা থেকে নিজের চিন্তার পথ খুঁজে নিতে
পারেন।... আর যে সকল সাধারণ পাঠকের পক্ষে এমনটা সম্ভব নয়, তারা আমার আলোচনা পাঠের
মাধ্যমে অন্তত আলোচ্য কবিতাগুলোর গহীন স্পর্শ করতে পারবেন।... অথবা কবিতার মতো
একটা উচ্চমার্গীয় শিল্পের পাঠোদ্ধার করার কলাকৌশল রপ্ত করতে পারবেন বলে আমার
প্রত্যাশা। এমনিতেই কবিতার প্রতি নানান শ্রেণির পাঠকের অভিযোগ আছে যে, তারা কবিতা
বুঝে না!... প্রসঙ্গত পুঁথির আসরের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে,
কবিতা বুঝে না বলে আক্ষেপ করা পাঠকদেরও কাব্যসুধা পান করানো সম্ভব।...
কবি ও
কবিতাকে গড়পড়তা গালমন্দ করা অনেক লোকের খবর(...) ইতিহাস হজম করেছে। আবার কবি ও
কবিতার ওপর গালভরা ফাঁপা প্রশস্তি (পরি)বেশনের কথাও(...) ইতিহাসে সঞ্চিত আছে।...
কবিতাকে কেউ কেউ ভাব বিলাসিতার উত্তম উপকরণ হিসাবে নিয়েছে/পেয়েছে।... আবার কেউ কেউ
আদর্শ ও নীতির বলিষ্ঠ অবলম্বন হিসাবে নিয়েছে/পেয়েছে।... ফলে বিষয় উপস্থাপনের
ক্ষেত্রে কবিতার রয়েছে বহুবিধ বৈচিত্রতা। কোনো কোনো কবিতা বা কবিতার একটি মাত্র
পঙক্তি ইতিহাস, সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, জগৎ-জীবন জিজ্ঞাসা, আধ্যাত্মিকতা প্রভৃতির
ক্ষেত্রে এমন গভীর ধারণা দিতে পারে, যা শত শত গবেষণা গ্রন্থের দ্বারাও দুষ্কর মূলত
বিদগ্ধ কবিতার প্রতি আমার এরূপ বিশ্বাস থেকেই কবিতা পাঠের এই লৈখিকরীতি বর্ণনে আমি
বদ্ধপরিকর হয়েছি।...
আশা করি,
এ কিতাবখানা পাঠককে যে কোনো কবিতার পাঠোদ্ধারের নতুন নতুন পথ/মত উস্কে দিতে সক্ষম
হবে।...
অতএব,
পাঠ+করে
যে> পাঠক,
পাঠ করুন
এবং নির্ম্মান করুন, আরও বিকল্প পাঠ!...
সকল
প্রশংসা কবিতার!...
আমেন—
দ্বীপ দিদার
...........................
সূচিপত্র
.......................................................
* লাঙ্গল বান্ধব
* গাজী ভঙ্গি শাহ
* অভিবাসী
মেঘ
* পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা
* পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা
* (উদ্)যাপনের কথামালা
* শরীর
শরীফ
* পরিবর্ত্তনা চৌধুরানি
* পাগলের পাগলদর্শন
* রাঘব > বোয়াল
* হিংসা পরম ধর্ম্ম, প্রকৃতির
* গ্রামপতনের ধ্বনি
* রাঘব > বোয়াল
* হিংসা পরম ধর্ম্ম, প্রকৃতির
* গ্রামপতনের ধ্বনি
* যুক্তাঞ্চল
* চিনিফানা
No comments:
Post a Comment