Tuesday, October 29, 2019

অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা 'অভিবাসী মেঘ’ এর পর্য্যালোচনা

অভিবাসী মেঘ, তুমি কোথা যাও?
জলের ডানায় উড়ে উড়ে যাও কোন সে দূরের গাঁয়? ...
এইখানে এসো।
কাজলা দিঘীর জলে ভাসা
দলকলমির
পাপড়ির উপর চুপটি করে বসো। ...
অভিবাসী মেঘ, তুমি কোথা যাও?
এইখানে এসো।
শোনো, ধানক্ষেতের আড়ালে
কাঁদছে
সদ্যোজাত যিশু!
শঙখলা নদীটির নীড়ে, গণকবরের
সবুজ ঘাসের ফুলে ফুলে দিয়ে যাও জলজ পরশ!…
কাঁটাতার ঘেরা শ্যামল সবুজে,
পৃথিবীর
গাঁয়ের আকাশে,
মন পবনের নাঁয়ে ভেসে ভেসে যাও
কোন সে দূরের গাঁয়?
ভাসছি অকূলে, সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের নাঁয়!
অথই সমুদ্রে
আশার ছলনে ভাসে কৌটিল্য নগর, কী ভাবে বাহিব দাঁড় উজানিয়া টানে! ...
অভিবাসী মেঘ, আমাকেও নিয়ে যাও! ...
      অভিবাসী মেঘ // আরণ্যক টিটো





মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূতম’ কাব্যে বিরহী যক্ষ তার প্রিয়ার কাছে দূত হয়ে যাওয়ার মিনতি করেছিলো মেঘকে।... এরপর থেকেই নাকি ভারতীয় কাব্য সাহিত্যে চেতন অবচেতনের ব্যবধান অনেকটা রহিত হয়েছিলো। কালিদাসের ‘মেঘদূতম' ছিলো শৃঙ্গার রস প্রধান কাব্য। ‘মেঘদূত' শিরোনামে কবিতা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তবে তার কবিতাটির মূল প্রেরণা কালিদাসের ‘মেঘদূতম' এবং তাতে প্রাধান্য পেয়েছে করুণ রসের। এরপর বাংলা সাহিত্যে আরও অনেক কবির অনেক কবিতার নানান উপকরণ হয়েছে মেঘ। ‘অভিবাসী মেঘ’ নামক কবিতায় মেঘকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘অভিবাসী’ বলে।...

‘অভিবাসী’ আজকের বিশ্বের বহুল আলোচিত একটি শব্দ। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ আজকে অভিবাসী হয়ে কঠিন করুণ মর্ম্মান্তিক পরিণতির শিকার হচ্ছে। আবার অনেক রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ত্তাব্যক্তিদেরও মাথাব্যথার শেষ নেই অভিবাসন সমস্যা নিয়ে। যেমন মধ্য এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অভিবাসন প্রত্যাশী লোকদের নিয়ে ইউরোপের অনেক রাষ্ট্র এখন দিশেহারা।...

পৃথিবীতে রাষ্ট্র উদ্ভবের পূর্ব্বে অভিবাসী বা অভিবাসন সমস্যাটি হয়তো ছিলো না। তখন মানুষ তার সাধ্যমতো এ গ্রহের যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারতো। এতে প্রয়োজন হতো না কারোর সম্মতি কিংবা কোনো পাসপোর্ট ভিসার। কিন্তু রাষ্ট্র উদ্ভবের পরে মানুষের সে স্বাধীনতা খর্ব্ব হয়ে যায়। পৃথিবীর পথে পথে গড়ে ওঠে নিষেধের প্রাচীর, কাঁটাতারের বেড়া। রুটিরোজগারের জন্য হোক অন্য কোনো কারণে হোক, এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রে বসবাস কিংবা অবস্থান করতে কর্ত্তৃপক্ষের অনুমতির রীতি গড়ে ওঠলো। কর্ত্তৃপক্ষের সম্মতিহীন কিংবা সম্মতির মেয়াদোত্তীর্ণ লোকদের বলা হলো, অবৈধ অভিবাসী কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। যাদের ওপর যে কোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে রাষ্ট্রপক্ষের কঠিন কঠোর নির্দ্দয় দমন অভিযান।...

এমনও দেখা যায় যে, কোনো আক্রান্ত দেশের নাগরিকদের পার্শ্ববর্ত্তী রাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়া হয় শরনার্থী নামে। শরনার্থী হোক, অভিবাসী হোক কিংবা অভিবাসন প্রত্যাশী হোক পৃথিবী নামক গ্রহটিতে তারা মূলত পরবাসী/পরদেশী/পরগ্রহী। কারণ তাদের জীবন জ্বলন্ত খাণ্ডব আর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, আইনের বিষাক্ত বলয়— এপারে থাকা তাদের দুঃসহ, ওপারে যাওয়া দুরাশা। এমনই কাঁটাতারের রীতি, এমনই সীমান্ত আইনের শাসন।…

ভারতীয় পুরাণে নাকি ডানাওয়ালা হাতির উল্লেখ আছে। আকাশে উড়ন্ত যে হাতি একদিন কোনো এক দেবতার অভিশাপে পাখা হারিয়ে মর্তের বর্ত্তমান হাতিতে পরিণত হয়। তাই প্রাচীন ভারতীয় অনেক সাহিত্যগ্রন্থে উড়ন্ত মেঘকে হাতির সাথে তুলনা করা হয়েছে। মেঘের ডানা কল্পনা করার ব্যাপারটি তখন থেকেই হয়তো ভারতীয়দের মাথায় আসে। বাংলা সাহিত্যের যত্রতত্রই মেঘের ডানার কথা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু অভিবাসী মেঘের কথা অর্থাৎ মেঘকে অভিবাসী বলে কেউ পূর্ব্বে কল্পনা করেছে কী না তা আমরা জানি না! মেঘ 'অভিবাসী' হলেও অভিবাসী মানুষের মতো দুর্দ্দশা/সীমাবদ্ধতা হয়তো তার নেই। পৃথিবীর আকাশে জলের ডানায় উড়ে উড়ে যেতে পারে দূর দূরান্তে। তাই অভিবাসী মেঘের প্রতি কথকের আহ্বান, যেন সে কাজলা দিঘির জলে ভাসা দলকলমির পাপড়ির উপর চুপটি করে বসে কথকের কথা শোনে। মেঘ যেন ধানক্ষেতের আড়ালে ক্রন্দনরত সদ্যোজাত যিশুর কাছে আসে।

ধানক্ষেতের আড়ালে/ কাঁদছে/ সদ্যোজাত যিশু— চরণটিতে অতিশয়োক্তি অলঙ্কারের প্রয়োগ করা হয়েছে। উপমেয় শিশু অনুপস্থিত— উপমান যিশু। এখানে শিশু এবং যিশুর মধ্যে কী রূপ অভেদত্ব নির্ম্মিত হয়েছে তা বোঝার জন্য আমাদের 'অভিবাসী' শব্দের সূত্র ধরে সাম্প্রতিক বিশ্বের ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর দিতে হবে। সমুদ্র সৈকতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শিশু আইলানের সে মর্ম্মান্তিক ছবিটি এত শীঘ্রই বিশ্ববাসীর হৃদয় থেকে মুছে যাবার কথা নয়। মাত্র কয়েক মাস আগে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশকারী একটি রোহিঙ্গা বোটে পাওয়া গিয়েছিলো একা একটি দেড়মাস কী তিন মাসের কন্যা শিশুকে। তাছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রত্যাশী লোকদের সাথে অনেক শিশুকে কাঁটাতারের বেড়া ধরে কাঁদতে দেখা গিয়েছিলো অনাহারে অর্দ্ধাহারে। এসব শিশু কি একটি রাষ্ট্রের কাছে পিতৃহীন কুমারী মাতার সন্তান যিশুর সমতুল্য নয়?! হয়তো একটু তফাত আছে— যিশু ছিলো জন্ম পরিচয়ের অভিবাসী আর এসব শিশুরা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অভিবাসী। এ তো গেলো চরণটির সাম্প্রতিক উপযোগিতা। সর্ব্বকালের উপযোগিতাটা তাহলে কোথায়?…

আমাদের দেশে এমন অনেক ঘটনা জানা যায় যে, পিতৃপরিচয়হীন অনেক কুমারী মায়ের কিংবা বারাঙ্গনাদের সন্তানকে ফেলে যাওয়া হয় ধানক্ষেতের আইলে ঝোপে ঝাড়ে নালায় ডাস্টবিনে।… সে-ও কি যিশুর মতো জন্ম পরিচয়ের ‘অভিবাসী’ নয়?!

পরের চরণে মেঘকে আহ্বান করা হচ্ছে— শঙখলা নদীটির নীড়ে গণকবরের সবুজ ঘাসের ফুলে ফুলে জলজ পরশ দিয়ে যাওয়ার জন্য।...

থাইল্যাণ্ডের একটি নদীর নাম শঙখলা। অনেকে হয়তো জানেন, এই নদীর তীরবর্ত্তী দূর্গম জঙ্গলে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের অসংখ্য অভিবাসন প্রত্যাশী মানুষের কবর আবিস্কৃত হয়েছিলো। যাদের অনেকের মৃত্যু হয়েছিলো সমুদ্রে নৌকায় ভেসে ভেসে ক্ষুধায় পিপাসায় রোগে ভোগে। সেই তৃষ্ণার্ত্ত মানুষগুলো'র কবরে জন্মানো ঘাস, ঘাসফুল সবই কি তৃষ্ণার্ত্ত মনে হয় না?!…

এখানে শঙখলা নদীর নাম উল্লেখিত হয়ে যেমন মালেশিয়ায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের গণকবরের কথা স্মরণ করাচ্ছে তেমনি ঐতিহাসিক কাল ধরে পৃথিবীর বুকে আবিষ্কৃত অনাবিষ্কৃত গণকবরের কথা স্মরণ করাচ্ছে। যেমন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা, প্রথম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা, বর্ত্তমানে মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকায় যুদ্ধাক্রান্ত অঞ্চলগুলিতে সংঘটিত গণহত্যা।… 'নীড়ে' শব্দের পরে কমার ব্যবহার চরণটিকে 'গণকবর' বিষয়ক অর্থ বিস্তৃতি দিয়েছে।

কাঁটাতার ঘেরা শ্যামল সবুজ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর গাঁয়ের আকাশে মন পবনের নাঁয়ে ভেসে মেঘ যাচ্ছে কোনো এক সুদূর গাঁয়ের পারে। কিন্তু কথকের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। কথক সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়ে ভাসছে অকূলে। অথই সমুদ্রে আশার ছলনে ভাসছে কৌটিল্যনগর। আর কথক সন্ধিগ্ধ হয়ে পড়ছে নৌকার প্রতি।...
সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়ের সাথে কৌটিল্য বা কৌটিল্যনগরের উল্লেখ ব্যাপারটিকে অনেক তাৎপর্য্যময় করে তোলেছে। কৌটিল্যের সাথে সপ্তাঙ্গতত্ত্বের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত কূটনৈতিক ধর্ম্মতাত্ত্বিক পণ্ডিত কৌটিল্য। ইতিহাসে তিনি চাণক্য নামে অধিক পরিচিত। রাজনীতি বিষয়ক তার বিখ্যাত গ্রন্থটি ‘চাণক্যের অর্থশাস্ত্র’ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ক প্রধান সাতটি নীতির কথা বলেন। আধুনিক রাষ্ট্রের উপাদান— ভূখণ্ড, জনগণ, সরকার, সার্ব্বভৌমত্ব কিংবা রাষ্ট্রের অঙ্গ— আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মতোই অর্থশাস্ত্র'র সাতটি নীতি কৌটিল্য প্রণীত রাষ্ট্রব্যবস্থার সপ্তাঙ্গ!...

কথকের সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়ে ভাসা এবং আশার ছলনে ভাসা কৌটিল্যনগর— কথাগুলো আমদের আরো একটু পরিষ্কার করে নিতে হবে।…

একথা সর্ব্বজন সম্মত যে, রাষ্ট্রীয় আইনের মতো রাষ্ট্রের সীমান্তপ্রাচীর রাষ্ট্র এবঙ রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনগণের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রে যখন নেমে আসে উচ্ছেদ অভিযান, যুদ্ধ, মহামারি, উপার্জ্জনের অনিশ্চয়তা কিংবা কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ তখন সে রাষ্ট্র অথবা পার্শ্ববর্ত্তী রাষ্ট্রের কাঁটাতার কিংবা সীমান্ত আইন আক্রান্ত জনগণকে কি অকূলে ভাসিয়ে রাখবে না? যেমনটি আমরা ভাসতে দেখেছি মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বঙ্গোপসাগরে, মায়ানমার ও বাংলাদেশের অনেক মানুষকে মালেশিয়া থাইল্যাণ্ডের উপকুলে এবং লিবিয়া সিরিয়া ইরাক মিসরসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভূমধ্য সাগরে কিংবা ইউরোপের উপকুলে। অভিবাসন প্রত্যাশী ভাসমান মানুষগুলোও স্বপন দেখে কৌটিল্য প্রণীত রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের!…

তাই অভিবাসী মেঘের কাছে কথকের মিনতি— মেঘ যেন কথককেও নিয়ে যায় সাথে...
এখানে সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়, আশার ছলনা, দাঁড়, উজানিয়া টান প্রভৃতি শব্দবন্ধের আধ্যাত্মিক তান্ত্রিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। না, ওদিকে আমরা যাবো না।...

মেঘদূতম্ কাব্যে মেঘকে আহ্বান ছিলো এক প্রকার রতিসুখের প্ররোচনা এবং কাব্যের অধিকাংশ চিত্রকল্পও ছিলে শৃঙ্গার সমৃদ্ধ। কিন্তু ‘অভিবাসী মেঘ’ কাব্যে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয় এবং চিত্রকল্প মর্মান্তিক হৃদয় বিদারক। তাই এখানে করুণ রসই প্রধান হয়েছে। অভিবাসী মেঘে যে ধ্বনি বা সুর মাধুর্য্য গড়ে উঠেছে তা কবিতার করুণ আবেদনকে দিয়েছে আরও গভীর বিস্তৃতি।…

অভিবাসী মেঘ শুধু সাময়িক কিছু ঘটনার বিবরণ নয়, তা সর্ব্বকালের কিছু দুর্দ্দশাগ্রস্থ মানুষের মর্ম্মান্তিক পরিণতির লেখচিত্র।…


No comments:

Post a Comment