Monday, October 28, 2019

অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা 'পাগলের পাগলদর্শন’ এর পর্য্যালোচনা

পাগল,
পথের মোড়ে বসে থাকে, বসায় পাহারা, পাগল দেখবে বলে!
দৃষ্টির নন্দনে, লোকটা পাগল,
আমাদের চেনাজানা,
দেখার পরিধি থেকে দূরে, পলক আড়ালে........
পাগলের
দৃষ্টির নন্দন, চেনাজানা, দেখার পরিধি থেকে দূরে...
আমরা সবাই আজব পাগল,
লোকটা হাসছে একা একা, আমাদের দেখে।
লোকটাকে দেখে আমরাও...
জগতের সকল পাগল সুখি হোক!
আমি ও আপনি, কে কার পাগল, কে কার অতিথি, বলছি অথচ,
আসুন,
অতিথি নারায়ণ,পথের পাগল, ভাঁটফুল ফোটা পথের হৃদয়ে বসে একটু মনের কথা কই,…………

     পাগলের পাগলদর্শন // আরণ্যক টিটো




কোনো এক পাগলের কাছে শুনেছিলাম গল্পটি— একদা এক রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলো— ভোরে রাজ্যজুড়ে বৃষ্টি হতে চলছে আর সে বৃষ্টির জল পান করলেই লোকে পাগল হবে। রাজার ঘুম ভাঙলো— হায় হায়, এ দেখি ভোর হয়ে এলো!... আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, মূহুর্তেই বুঝি বৃষ্টি নামে! পুকুরগুলোই রাজ্যের খাবার পানির উৎস, এইমাত্র সেগুলো অভিশপ্ত বৃষ্টির জলে সয়লাব হবে। রাজা মন্ত্রীকে ডাকলো— মন্ত্রণা হলো, প্রাসাদ সংলগ্ন পুকুরটায় কোনো রকম ছাউনি দেওয়া হলো। কিন্তু প্রজাদের কাছে এলান পৌছানোর আগেই বৃষ্টি নামলো। আর ততক্ষণে প্রজারা বৃষ্টির জল পানও করে ফেললো। প্রজাদের যখন রাজপ্রাসাদে ডাকা হলো, রাজার কথা শুনে সবাই তিরস্কার করলো। রাজাকে সবাই পাগল বলে গালি দিলো। রাজাও এতো সহজ পাত্র নয়, প্রজাদের পাগল বলে রাজাও অনেক শাসালো। এভাবে চলতে থাকলো, একে অপরকে পাগল প্রমাণের প্রতিযোগীতা। রাজা-প্রজার এ পাল্টপাল্টি অভিযোগ কতো দিন কতো কাল চলেছিলো, গল্পকার পাগল তা আমাকে বলে যাননি। সুতরাং এখানেই গল্পের আখের।…
আমার এক বন্ধু আছে, কোনো এক মারেফতি ফকিরের কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর যার আচার আচরণ স্বাভাবিক মানুষ থেকে অনেকটা আলাদা হয়ে যায়। মুর্শিদ নির্দেশিত পন্থায় সে আরোপিত জ্ঞান বিদ্যা/আলি কালি থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করছিলো। তার অন্তর চোখের সত্তর হাজার পর্দা একে একে সরে যাচ্ছিলো।… আমার এ বন্ধুকে সবাই পাগল বলে জানে; তাকে নিয়ে অনেকেই বেশ হাসি ঠাট্টাও করে।...

কোনো একজন রমজানের ঈদের আগের দিন তাকে বলেছিলো, আফছার কাইলকা ত ঈদের দিন, চুল দাড়ি কামাইবি না? আফছার উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে, ঈদের দিন এক্কান আছে নিহি আবার? কাইলকা কি দিনের পিঠে ঈদ লেখা থাইকবে নাকি সূর্য্য/বেইলের পিঠে? আফছারের এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে দোকান ভর্ত্তি লোকের সে কী উপচে পড়া হাসি!…

আরেক দিন একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, বিয়ে তা একটা করবানি আফছার? করলে কও, মাইয়া এক্কান দেহি। জবাবে আফছার বলে, তাই নিহি মিয়া? ত, তোমারেও ত আমার মাইয়া লোকের মতন লাগে।... আফছারকে ঝাড়ফুঁক করার জন্য তার বড় ভাই একদিন এক ওঁঝা নিয়ে আসে। আফছারের বিশেষ আকুতি উপেক্ষা করে একসময় সত্যি সত্যি ওঁঝা ঝাড়ফুঁক আরম্ভ করে। তার সারা শরীরে বিকট দুর্গন্ধি কোনো তরল মালিশ করা হয়, চোখে মরিচগুঁড়া মেশানো জল ঢালা হয়। সে একটু প্রতিবাদ করে নিজেকে ছাড়াতে চাইলে, ওঁঝার নির্দেশে কয়েকজন প্রতিবেশি জোয়ান তাকে আরো জোরে চেপে রাখে। সবার ভাবনা — তাড়া খেয়ে, আছর করা জ্বিনটার উপদ্রব বাড়ছে।

এসব কথা পরদিন আফছার আমাকে যখন বলছিলো, তখন হাসতে হাসতে সে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। বলে, পাগলরে নিয়া কী পাগলামিই না অরা করলো, দিদু!

আমার এক রুমমেট ছিলো, যে উদ্ভট কিছু চিন্তা করতো। তার আজগুবি কথাবার্ত্তা শুনে অনেকেই জিভ কামড়াতো, তওবা পড়তো। সে বলে বেড়াতো, মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীদের কিছুটা বৈশিষ্ট্যগত তফাত থাকলেও, মানুষ কিছুতেই শ্রেষ্ট জীব নয়। জন্ম আর মৃত্যু সম্পর্কিত ধারণা মানুষের কল্পনা মাত্র— এমন আরো ইত্যাদি ইত্যাদি।... মাঝে মাঝে সে মানুষের বিকল্প সম্পর্ক, বিকল্প পরিবার, বিকল্প সমাজ ও বিকল্প রাষ্ট্রের নিজস্ব ধারণাও ব্যক্ত করতো।(...)

একসময় সে তার এসব আজগুবি চিন্তা নিয়ে নিজেই বিব্রত হওয়ায়, চিকিৎসার জন্য আমি তাকে একজন মনের ডাক্তারের নাম প্রস্তাব করি।…

একদিন সে আমার হাতে একটা ওষুধের পুটলি তুলে দিয়ে বললো, কী এক পাগল ডাক্তারের কাছে পাঠাইলেন, ভাই! বলে আমার কিনা হ্যালিসুনেশন, আরও আজেবাজে কী কী!... ঐ ডাক্তার হালায় কি চায়, দুনিয়ার আর সব মানুষগুলার মতন আমিও পাগল হয়ে যাই?…

একদা আমি এক পত্রিকা অফিসে খণ্ডকালীন কাজ করতাম। ওখানে মাঝেমধ্যে এক ভদ্দরলোক আসতেন একটি পুরাতন ফাইল বগলে নিয়ে। লোকটির (উপ)স্থিতি অফিসের সবার জন্য বিরক্তিকর ছিলো। কিন্তু তা প্রকাশ করার সাহস কারোর ছিলো না। অফিসের কার সঙ্গে লোকটির কী প্রকার সম্বন্ধ তাও কেউ জানতাম না। একটু সুযোগ পেলেই লোকটি যে কাউকে বগলের ফাইলটি খুলে কিছু গদ্য-পদ্য পড়ে শুনাতেন এ নিয়ে আমাদের বিরক্তির সীমা ছিলো না।... অফিসে শহরের নামকরা অনেক কবি সাহিত্যিকও আসতেন। এমন কাউকে পেলেই লোকটি নিজের নামের সাথে আরো কিছু বিশেষণ জুড়ে পরিচিত হতেন এবং ফাইলটা খুলে কিছু না কিছু পড়ে শুনাতেন।... এমন কি অনেক বড়ো বড়ো সাহিত্যিকদের রচনার সাথে লেখাগুলোর তুলনাও করে দেখাতেন।... আগত কবি সাহিত্যিকদের কাউকে লোকটার লেখার ওপর কোনো মন্তব্য করতে শুনিনি কখনো। তবে অনেকেই যাওয়ার সময় সম্পাদকের কানে কানে বলে যেতেন, এ পাগল কোত্থেকে আমদানি হে! লোকটার লেখা সম্পর্কে কবি সাহিত্যিক ও আমাদের নিরবতা তাকে কিছুটা হতাশ ও ক্ষিপ্ত করতো। তিনি বিড়বিড় করে বলতেন, সব মূর্খ, উন্মাদের দল!...

আমাদের ওদিকে এক সাবেক ছাত্রনেতা ছিলেন, যিনি কোনো এক সময় বিভিণ্ন ছাত্রআন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি দেশবিদেশের অনেক বড়ো বড়ো রাজনৈতিক নেতারও সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করতেন। কখনো কখনো দেশের সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের পাগল আখ্যা দিয়ে অশ্রাব্য গালমন্দ করতেন(…) আমরা সবাই তাকে পাগল বলতাম, এমন কি তার সাবেক সহকর্মীরাও।

জীবনে বড়ো শখ ছিলো পাগল সাজবার। একদিন তাই করে বসলাম— অমাবস্যার রাত, সাগরপাড়ে নির্জন চরে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, অনেক্ষণ পর বন্ধুদের আগমন টের পেয়ে শুরু করে দিলাম পাগল পাগল খেলা।… সাধ্যমতো নিখুঁত পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বন্ধুরা নিশ্চিত হলো, সত্যি পাগল হয়েছি।… একজন মন্তব্য করলো, আমার যে আজেবাজে চিন্তা ভাবনা তাতে পাগল হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। আমাকে এক হুজুরের কাছে নিয়ে গেলো; হুজুর কিছুটা ঝাড়ফুঁক করলেন এবং আমার চোখ-মুখ দেখে আশঙ্কাও প্রকাশ করলেন। আমাদের বাড়ির অদূরে আলাদা কাছারি ঘরে আমি থাকতাম। বন্ধুরা আমাকে সেখানে রেখে দিলো। একজন বাড়ির লোকজনকে খবর দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। অন্যজন বাড়ির লোকজন কর্ত্তৃক পরিস্থিতির জন্য নিজেরাই দায়ী হওয়ার আশঙ্কা জানায়। একজন কাউকে আমার সাথে অন্তত রাতটা থাকতে বলে। যে নিজের ঘরে ভূতের ভয়ে আমার সাথে শুইতো, সে জবাব দেয়, না না,আমি পারুম না ভাই! আমারে চেপেটেপে ধরলে আমি কী করমু?

একসময় বন্ধুরা আমাকে একা ছেড়ে যে যার বাড়ি যেতে বাধ্য হয়। ভেবেছিলাম নাটকটা কিছুদিন চালিয়ে যাবো। কিন্তু এ কয়েক ঘন্টার অভিনয়ে বুঝলাম, এটা আর দীর্ঘায়িত করলে আমাকে সারা জীবনের জন্যই পাগল বনে থাকতে হবে। তখন হয়তো, আমি নিজেকে যতোই সুস্থ দাবি করবো ততোই পাগল ভাববে লোকে!...
এখন পাঠ নেয়া যাক, ‘‘পাগলের পাগলদর্শন’’। (…………………..)

দেখি— একে অপরের চেনাজানা দেখার পরিধি থেকে কে কতোটা দূরে, কে কতোটা পাগল একে অপরের কাছে। লক্ষ্য করি, আমাদের পানে তাকিয়ে হাসছে কী না কোন পাগলবোধক চিহ্ন!...

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা ভালোবেসে আদর করেও একে অপরকে পাগল বলে ডাকি। প্রিয় মানুষটিকে পাগলের মতো ভালোবাসি, প্রিয় মানুষটির প্রতীক্ষায় থাকি পাগলের মতো। জগতে আমরা প্রত্যেকেই যেন কারো না কারোর পাগল, প্রত্যেকের জন্যই যেন কেউ না কেউ পাগল/মজ্জুব/অতিথি/নারায়ণ। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে পাগল বিদ্রোহ(...) যেমন আছে, তেমনি আমাদের লোকসমাজে পাগল নিয়ে নানা রকম বিশ্বাস প্রচলিত আছে। যেমন পাগল আল্লাওয়ালা/পাগল খোদার অতিথিএমন আরো কতো কথা।... গুরুজন বলেন, পাগলকে হিংসা করতে নেই, পাগলকে আঘাত করতে নেই। গুরুজন জানেন মজনু পাগলার কথা, শামসেত তাবরিজের কথা। এ-ও জানেন, আমাদের চেনাজানা পরিধির বাইরে পাগল এক পরমার্থিক গুণে গুণান্বিত চরিত্র!...
অতএব, জগতের সকল পাগল সুখি হোক!...

আমেন!...

No comments:

Post a Comment