Tuesday, October 29, 2019

(কর্ম্ম)কান্ডের নেপথ্য বয়ান—

আমাদের গ্রামে পুঁথি পাঠের আসরে একজন ভাষ্যকার/পন্ডিত থাকেন। ভাষ্যকার অনেকটা দোঁভাষির/অনুবাদকের কাজ করেন। পড়ুয়া পুঁথির ভাষায় সুর করে পড়েন আর ভাষ্যকার আঞ্চলিক ভাষায় শ্রোতাদের কাছে তার মর্ম্মার্থ পরিবেশন করেন।... পড়ুয়ার পঠিত অংশের অনুবাদ করতে গিয়ে ভাষ্যকার বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পঠিত অংশের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন বিচিত্রভাবে।... এভাবেই পুঁথির আসরে শ্রোতারা পুঁথি সাহিত্যের স্বাদ (উপ)ভোগ করেন।...

আমার বাবা পুঁথির আসরের একজন ভাষ্যকার ছিলেন। বাড়িতে পুঁথি পাঠের চল্ থাকায় শৈশবেই পুঁথির আসরের সংস্পর্শ পেয়েছি। কখনো কখনো ছোটোখাটো আসরে ভাষ্যকার হিসাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে আমারও। তাছাড়া গ্রামে আমার ব্যাক্তিগত পাঠাগারে এমন কিছু আসর জমতো, যেখানে আমি রবীন্দ্র-নজরুল'র কবিতা পাঠ করে তার মর্মার্থসহ আঞ্চলিক ভাষায় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতাম।... গ্রামের অনেক সমবয়সি স্বাক্ষর-নিরক্ষর যুবক তখন আহ্লাদের সাথেই কাব্যের ভাবসুধা উপভোগ করতো। সেই থেকে সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে আমার এমন এক প্রবণতা গড়ে ওঠে যে, কোনো টেক্সট পাঠকালে নিজের তথ্যগত অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যিকের অভিজ্ঞতাকে যত দূর সম্ভব মিলিয়ে না দেখলে সাহিত্যের কোনো রকম স্বাদই পাই না!

এ কিতাবে আমি কিছু কবিতা পাঠ ও আমার পঠনরীতি বর্ণনার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন করতে চেয়েছি।... এটা কিছুতেই সমালোচনাগ্রন্থ নয়; এতে আমি সচেতনভাবেই গতানুগতিক সমালোচনারীতি থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছি। তবুও কোনো সমালোচনামূলক বক্তব্য যদি এখানে থেকে থাকে তবে তা আমার বর্ণন সরল করার অভিপ্রায় মাত্র।...

আমার বিশ্বাস, যে কোনো বিদগ্ধ সাহিত্যিক নিজেই তার রচনার উত্তম সমালোচক।... একজন বিদগ্ধ সাহিত্যিক তার রচনায় শব্দ, বাক্য, পঙ্ক্তি, চরণ, যতি/ছেদসহ নানান উপাদান চয়নে বরাবরই সচেতন থাকেন এবং প্রত্যেক শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে তার থাকতে পারে বিশেষ বিশেষ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।...

তার মানে আমি বলতে চাচ্ছি না যে, সাহিত্যের কোনো সমালোচনা হয় না কিংবা সাহিত্যে সমালোচনার কোনো গুরুত্ব নাই। অবশ্যই সমালোচনাও একপ্রকার সাহিত্য এবং সাহিত্যাঙ্গনে তার গুরুত্বও বিস্তর। আবার চাইলেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোনো টেক্সটের ‘মিঠেকড়া’ জাতীয় তিক্ত সমালোচনা লেখা সম্ভব। অথবা টেক্সটের সমালোচনা করতে গিয়ে রচয়িতার নামে আকাস-কুসুম প্রশস্তি রচনাও সম্ভব। প্রচলিত সাহিত্য সমালোচনারীতির কোনো পদ্ধতিতেই আমার মনষ্কাম সিদ্ধ হওয়ার নয়। তাছাড়া পাঠোদ্ধারের দিকেই আমার ঝোঁক বেশি হওয়ায় সমালোচনা পদ্ধতি অনুসরণ করে টেক্সটের পুঙ্খানুপুঙ্খ গভীর আলোচনা দুষ্কর বলেই মনে হয়েছে। তাই আমার পঠনরীতিই আমি সরাসরি বর্ণনের প্রয়াস করেছি। অবশ্যই সমালোচনা সাহিত্যের মতো এ কাব্যপঠনরীতিকেও আমি সাহিত্যের রূপ দিতে চেয়েছি। কিন্তু তা সাহিত্যের প্রচলিত শাখা সমুহের সাথে না-ও মিলতে পারে।...

পাঠ(ক) সর্ব্বদা নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়িই একটি টেক্সটের পাঠোদ্ধারে সক্ষম হন। কাব্য সাহিত্য এমনিতেই সমাজের মুষ্ঠিমেয় মানুষের সাহিত্য হিসাবে (পরি)গণিত। তার ওপর কাব্যে ইতিহাস, পুরাণ, অধ্যাত্মিকতা, দর্শন, সমাজ-রাজনীতি ও জগৎ-জীবন জিজ্ঞাসার মতো জটিল অনুষঙ্গ থাকলে সাধারণ পাঠকের কাছে কাব্যের যথার্থ পাঠোদ্ধার করা দুরহ হয়ে পড়ে (টেক্সটের আদি ও নিরেট প্রবণতা চিহ্নায়ন তো দূরের কথা...)। অবশ্যই এরূপ সচেতন পাঠকও থাকেন যারা হয়তো সংশ্লিষ্ট টেক্সটের এমন গভীর পাঠ নিতে সক্ষম হন, রচনাকালে রচয়িতা যার ধার-কাছও ছুঁতে পারেন না।...

কাব্য যদি (অনু)ভবের/(উপ)লব্ধির জিনিস হয় তাহলে এর একেবারে সঠিক ব্যাখা-বিশ্লেষণ অসম্ভব। কিন্তু কাব্যে যে বুঝবার মতো একেবারেই কিছু থাকে না, তা বলা যাবে না। কাব্য যতটা শিল্প তার চেয়ে বেশি তা ভাপ্রকাশের একটি উচ্চমার্গীয় মাধ্যম। যে সব উপাদানের সমন্বয়ে কাব্য নির্ম্মিত হয় তার প্রত্যেকের কিছু না কিছু অর্থময়তা থাকে... ফলে এসব উপাদান নানাভাবে বিশ্লেষণ করলে কোনো না কোনো ভাব অবশ্যই ধরা পড়ে।... তাই বলে কাব্য পাঠে যে একপ্রকার বোধগম্যতার অতীত আনন্দ/রস আস্বাদন মিলে, এ কথা অস্বীকার করা চলে না।... মাঝে মধ্যে একধরণের নৈতিকতায় আক্রান্ত হয়ে নিজেই নিজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছি কবিতার ওপর এমন আলোচনা, সংশ্লিষ্ট কবিতার পাঠের ক্ষেত্রে পাঠকের স্বাধীনতা খর্ব্ব করবে কী না, এই ভেবে! সাধারণ পাঠ(ক) যে আমার আলোচনা দ্বারা (প্র)ভাবিত হবেন না,  তা হলফ করে বলা যায় না। কিন্তু একেবারে স্বাধীনতা খর্ব্ব করার অভিযোগ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যে কোনো সাহিত্য পাঠেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রচয়িতার চিন্তায় পাঠকের আটকা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্যই বিদগ্ধ পাঠ(ক) হলে রচয়িতার চিন্তা থেকে নিজের চিন্তার পথ খুঁজে নিতে পারেন।... আর যে সকল সাধারণ পাঠকের পক্ষে এমনটা সম্ভব নয়, তারা আমার আলোচনা পাঠের মাধ্যমে অন্তত আলোচ্য কবিতাগুলোর গহীন স্পর্শ করতে পারবেন।... অথবা কবিতার মতো একটা উচ্চমার্গীয় শিল্পের পাঠোদ্ধার করার কলাকৌশল রপ্ত করতে পারবেন বলে আমার প্রত্যাশা। এমনিতেই কবিতার প্রতি নানান শ্রেণির পাঠকের অভিযোগ আছে যে, তারা কবিতা বুঝে না!... প্রসঙ্গত পুঁথির আসরের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, কবিতা বুঝে না বলে আক্ষেপ করা পাঠকদেরও কাব্যসুধা পান করানো সম্ভব।...

কবি ও কবিতাকে গড়পড়তা গালমন্দ করা অনেক লোকের খবর(...) ইতিহাস হজম করেছে। আবার কবি ও কবিতার ওপর গালভরা ফাঁপা প্রশস্তি (পরি)বেশনের কথাও(...) ইতিহাসে সঞ্চিত আছে।... কবিতাকে কেউ কেউ ভাব বিলাসিতার উত্তম উপকরণ হিসাবে নিয়েছে/পেয়েছে।... আবার কেউ কেউ আদর্শ ও নীতির বলিষ্ঠ অবলম্বন হিসাবে নিয়েছে/পেয়েছে।... ফলে বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কবিতার রয়েছে বহুবিধ বৈচিত্রতা। কোনো কোনো কবিতা বা কবিতার একটি মাত্র পঙক্তি ইতিহাস, সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, জগৎ-জীবন জিজ্ঞাসা, আধ্যাত্মিকতা প্রভৃতির ক্ষেত্রে এমন গভীর ধারণা দিতে পারে, যা শত শত গবেষণা গ্রন্থের দ্বারাও দুষ্কর মূলত বিদগ্ধ কবিতার প্রতি আমার এরূপ বিশ্বাস থেকেই কবিতা পাঠের এই লৈখিকরীতি বর্ণনে আমি বদ্ধপরিকর হয়েছি।...

আশা করি, এ কিতাবখানা পাঠককে যে কোনো কবিতার পাঠোদ্ধারের নতুন নতুন পথ/মত উস্কে দিতে সক্ষম হবে।...

অতএব,
পাঠ+করে যে> পাঠক,
পাঠ করুন এবং নির্ম্মান করুন, আরও বিকল্প পাঠ!...

সকল প্রশংসা কবিতার!...

আমেন—
দ্বীপ দিদার


...........................
সূচিপত্র
.......................................................
* লাঙ্গল বান্ধব
* গাজী ভঙ্গি শাহ
* অভিবাসী মেঘ
* পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা
* (উদ্)যাপনের কথামালা
* শরীর শরীফ
* পরিবর্ত্তনা চৌধুরানি
* পাগলের পাগলদর্শন
* রাঘব > বোয়াল
* হিংসা পরম ধর্ম্ম, প্রকৃতির
* গ্রামপতনের ধ্বনি
* যুক্তাঞ্চল
* চিনিফানা 

অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা 'লাঙ্গল বান্ধব’ এর পর্য্যালোচনা


পরমা প্রকৃতি জানে, পরমপুরুষে, লিঙ্গের কাহিনি জানে শিবের লাঙ্গল!
অকর্ষিত মাঠে,
‘এই
থি-তি থিতি' বোলে
হালের বিছাল চষে হলরেখা, মাটির জনন!...
শিল্প হলো অর্দ্ধনারীশ্বর, যাহার অর্দ্ধেক শিব
অর্দ্ধেক পার্ব্বতী!
মন রে,
কৃষিকাজ জান না, আনন্দসাধনে!
মেঘলা মনের চুম্বনে, জল ঝরঝর বরিষনে অভিভূত
চারণ কৃষক কালিদাস
মাটির শরীরে দেয় শস্যজ ইশারা!
ভূঁইয়া
বর্ষায় নেবে ভূমির পরশ, শ্রাবণে নিয়েছে পাঠ লাঙ্গলের ভাষা,
কতোটা গভীরে ফলে শস্যজ শ্যামশ্রী!...
শ্যামলিমা,
দিয়েছে যে মন,
পলির নন্দন মাখা ভূমির দখল, দখলিয়া নদীর কিনারে।...
দূরবনে
পাখিটা ডাকছে থেমে থেমে,
কৃষ+ণ> কৃষ+ই> কৃষ+টি!...
      আহা! কৃষ্ণ কোথায় রে? রাধা, ধারাপাত পড়ে, লাঙ্গলের!...

     লাঙ্গল বান্ধব // আরণ্যক টিটো




আরণ্যক টিটো’র কবিতা পাঠ মানে শব্দের বহুরৈখিক ভাবের জগৎ পরিভ্রমণ করা। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি উদ্ভাবন করে কলিম খান দেখিয়েছেন কী ভাবে একটি মাত্র শব্দের হাত ধরে মানব সমাজের অতীত থেকে বর্ত্তমান অবস্থার নানা দিগন্ত উন্মোচন করা যায়।… আর তা আরণ্যক টিটো কবিতায় প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন, একটি কবিতা কী ভাবে বিচিত্র বিষয়কে ধারণ করে একটি জীবন দর্শনে স্থিতি লাভ করে। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি ছাড়াও শব্দকে বহুরৈখিক অর্থে (উপ)স্থাপন করতে অনুসরণ করেন কিছু নিজস্ব রীতিও।… শব্দের বহুরৈখিক ব্যঞ্জনা কবিতাকে দেয় বহুরৈখিক অর্থময়তা। আর বহুরৈখিক চরণ সম্পূর্ণ কবিতাটিকে দেয় বহুরৈখিক ভাবময়তা। শুরু হয় একটি শব্দ দিয়ে, তারপর সে শব্দ আরো অনেক শব্দের সাথে নানাবিধ সম্পর্ক পাতাতে পাতাতে খেলা করে বিচিত্র ভাবের সাথে।... শেষ পর্যন্ত বিচিত্র ভাবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি ভাবকাঠামো। যেমন— ‘লাঙ্গল বান্ধব’ কবিতা।

ভাবতে পারেন, লাঙ্গল তো এখন বিলুপ্ত— কেনো তবে লাঙ্গলের কথা?!…

কৃষকের লাঙ্গল হয়তো লোপ পেয়েছে। কিন্তু লাঙ্গলের সাথে আমাদের শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম্ম, অর্থনীতি, রাজনীতির কতো গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান এবং আগামীতে তা কতোটা অবলুপ্ত থাকবে সে রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য গভীর মনোযোগের সাথে পাঠ করতে হবে ‘লাঙ্গল বান্ধব’

কবি বলতে চাচ্ছেন— পরমা প্রকৃতি জানে, পরম পুরুষে, লিঙ্গের কাহিনি জানে শিবের লাঙ্গল!…

আদি মৈথুন তত্ত্ব মতে, ‘প্রকৃতি’ মানে ক্ষেত্র আর ‘পুরুষ’ হচ্ছে চিৎ শক্তি/কর্ষক— প্রাচীন ভারতীয় শৈব, শাক্ত উভয় ধর্ম্মতত্ত্বে সে কথা বিবৃত আছে।… প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে পরমা প্রকৃতি হচ্ছে ‘ব্রহ্মযোনি’ আর পরম পুরুষ হচ্ছে ‘কর্ম্মময় চিৎ-শক্তি’, যা জগৎ সৃষ্টির মূল কারণ। পণ্ডিতদের মতে, আদি মৈথুন তত্ত্বের সাথে ধর্ম্মের কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। এজন্যই হয়তো প্রকৃতি-পুরুষের মতো কুন ফায়া কুন, আত্মা-পরমাত্মা প্রভৃতি ধর্ম্ম সম্পর্কিত বিশ্বাসের সাথে একটা মিল পাওয়া যায়। আবার প্রত্যেক পদার্থের/পরমাণুর মধ্যে চিৎ-শক্তি বিদ্যমান— বিজ্ঞানের এমন ধারণা ও ধর্ম্ম দর্শনের সাথে একাকার হয়ে যায়।

আচ্ছা শিবের লাঙ্গল কেনো লিঙ্গের কাহিনি জানে?! শিব, লিঙ্গ, লাঙ্গল এমন শব্দের মধ্যকার সম্পর্কটাই বা কী?!…

ভারতীয় মাত্রই শিব আর লিঙ্গের একপ্রকার সম্পর্ক বুঝে নিতে পারেন। কিন্তু লিঙ্গের সাথে লাঙ্গলের কী সম্পর্ক হতে পারে?!…

হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় রচিত "বঙ্গীয় শব্দকোষ" আমাদের জানাচ্ছে, লিঙ্গ শব্দের একটি অর্থ ‘জ্ঞানসাধন’। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি অনুসারে লীন হওয়ার জন্য যা গমন করে তা-ই ‘লিঙ্গ’। সুতরাং শুধুমাত্র পুংলিঙ্গ নয়, লীন হওয়ার জন্য যা যা গমন করে সবকিছুই লিঙ্গ পদবাচ্য বলে বিবেচিত। সে অর্থে লাঙ্গল শব্দও লিঙ্গ পদবাচ্য। আরো পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, লিঙ্গ হচ্ছে একপ্রকার ‘শক্তি’ বা ‘আধেয়’।... যাস্ক'র মতে, প্রত্যেক শব্দই ধাতু নিষ্পন্ন। পানিণি বলেছিলেন, একই ক্রিয়ামূল উৎসজাত সব শব্দ একই ধরণের পদবাচ্য হবে, যা বর্ণভিত্তিক শব্দার্থবিধিরও ভাষ্য।... সুতরাং এদিক থেকেও লাঙ্গল শব্দ লিঙ্গ জাতীয় পদবাচ্য।... সুতরাং এখন বুঝা যাচ্ছে কর্ম্মযোগী শিবের সাথে লিঙ্গ ও লাঙ্গলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা আবার উৎপাদনজনিত।

এবার আসা যাক, আমাদের কৃষি সংস্কৃতিতে— লক্ষ্য করি চিত্রকল্পনা— কৃষক বোল দিচ্ছে— এই থি-তি থিতি। হালের বিছাল চষে যাচ্ছে, ঘটছে মাটির জনন।... হালের বিছাল হয়তো এখন নাই। কিন্তু কৃষক, শিল্পী তো আছে, মাটির/শিল্পের জনন তো ঘটাচ্ছে। এখানে খেলাটা বুঝতে হবে— ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে— পণ্যের দিকে যাবো নাকি উৎপণ্নের দিকে।…

কবির মতে— শিল্প হলো অর্দ্ধনারীশ্বর, যাহার অর্দ্ধেক শিব
অর্দ্ধেক পার্ব্বতী!
ভারতীয় পুরাণ মতে, সৃষ্টি মাত্রই অর্দ্ধনারীশ্বর। সুতরাং সেই অর্থে মানবসমাজ, সমাজের উৎপাদিত সামগ্রী সবকিছুই অর্দ্ধেক শিব হলে অর্দ্ধেক পার্ব্বতী। প্রাচীন ভারতীয় সাম্যবাদী সমাজে নাকি নারী-পুরুষ কিংবা কর্ম্মী-জ্ঞানী’র মধ্যে কোন বৈষম্য ছিলো না। উৎপাদন কাজে যেমন সবারই সমান অংশ গ্রহণ ছিলো তেমনি উৎপাদিত সামগ্রী বণ্টনেও সবাই সমান অংশ পেতো। সম্পূর্ণ ব্যাপারটি অনুধাবণ করার জন্য এখানে ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থ বিধির শব্দের বহুরৈখিকতার ইঙ্গিতটি মাথায় রাখতে হবে। এখানে নারী যেমন স্ত্রীলিঙ্গ তেমনি কর্ম্মীও। পুরুষ যেমন চিৎশক্তি তেমনি আবার জ্ঞানযোগীও। ঠিক একই ভাবে ভাবতে হবে শিব-পার্ব্বতী শব্দগুলো সম্পর্কেও। তাহলে আমরা প্রাচীন ভারতীয় সাম্যবাদী সমাজের পাশাপাশি উত্তর আধুনিক প্রপঞ্চের নারী-পুরুষ, কর্ম্মযোগী জ্ঞানযোগী’র মধ্যে আধিপত্যহীন কাঙ্খিত সমাজ ব্যবস্থাটাকেই পাবো। সমাজের যেমন নারী-পুরুষ বৈষম্য থাকবে না তেমনি বৈষম্য থাকবে না শ্রমিক-মালিকে, কর্ম্মী-জ্ঞানীতে, শাসিত-শাসকে, প্রান্ত-কেন্দ্রে।… সুতরাং আমাদের শিল্প, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সবকিছুই হবে অর্দ্ধনারীশ্বর! আমাদের শিল্প হবে না কেবলই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আক্রান্ত।… প্রকৃতি আর পুরুষের মধ্যে থাকে নিজ নিজ যোজনগন্ধ, যা কামনা বা কাজ করার ইচ্ছার মতো। স্ব-স্ব যোজন গন্ধ উভয়ের মাঝে যোগ ঘটালে ঘটে রতিক্রিয়া। আর তাতেই সম্পাদন হয় উৎপাদন কর্ম্ম।... সুতরাং প্রকৃতি পুরুষের সমান অংশগ্রহণ— এতে কারও ওপর কারওর আধিপত্য নাই।…

পাঠ করা যাক—
মন রে,
কৃষিকাজ জান না, আনন্দসাধনে!
মেঘলা মনের চুমবনে, জল ঝরঝর বরিষনে অভিভূত
চারণ কৃষক কালিদাস
মাটির শরীরে দেয় শস্যজ ইশারা!
ভূঁইয়া
বর্ষায় নেবে ভূমির পরশ, শ্রাবণে নিয়েছে পাঠ লাঙ্গলের ভাষা,
কতোটা গভীরে ফলে শস্যজ শ্যামশ্রী!…

কবি কৃষিকাজ এবং শিল্প রচনা বা কাব্য রচনার বিষয়কে আনন্দ সাধনের সাথে সম্পর্কিত মনে করেছেন। আর কালিদাসকে বলেছেন চারণ কৃষক, যে ভূমির পরশ নিচ্ছে, লাঙ্গলের ভাষার পাঠ নিচ্ছে। কৃষিকাজের সাথে কাব্যচর্চ্চার ব্যাপারটাকে আরও অনেকেই হয়তো তুলনা করেছেন। কিন্তু ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি এখানে আমাদের আরও  একটি গভীর সম্পর্কের ধারণা দিতে পারে। যেমন— লিঙ্গের লীন হওয়ার জন্য গমন আর কলমের লীন হওয়ার জন্য গমনের ব্যাপারটা একই। সুতরাং লিঙ্গের সাথে শিব কিংবা কৃষকের লাঙ্গল আর লাঙ্গলের সাথে কবি কালিদাসের কলমের সম্পর্কের কী দারুণ সাদৃশ্য!...

কৃষিকাজটা আনন্দ সাধনের সাথে কতোটা সম্পর্কিত হতে পারে?! কয়েকদিন গরুর জায়গায় লাঙ্গল টানার ভার নিয়ে বুঝেছিলাম এ কাজ বড়ই কষ্টের। আবার মাটি ও প্রকৃতির নৈকট্য পেয়ে কেমন এক অব্যক্ত আনন্দও যেন পেয়েছিলাম।...

কিছুটা আন্তর্বয়ানে, কিছুটা বিনির্ম্মাণে উচ্চারিত হয়েছে— মন রে কৃষিকাজ জান না, আনন্দ সাধনে!... ভক্ত কবি ‘রামপ্রসাদ সেন’ কৃষিকাজ না জানার কারণে মানব জমিন পতিত থাকায়, আক্ষেপ করেছিলেন তার গানে। অবশ্যই রামপ্রসাদ কৃষির রূপকে দেহ আচমন বা দেহ সাধনেরই ইঙ্গিত করেছিলেন। এখানে ব্যাপারটি (বি)নির্ম্মিত হয়ে কৃষিচর্চ্চায়/কাব্যচর্চ্চায় আনন্দ সাধনেরই বার্ত্তা দিচ্ছে।…

একসময় আমাদের অর্থনীতি যেমন ছিলো মাটি ও প্রকৃতির নিবিড় বন্ধনের তেমনি আমাদের শিল্প-সাহিত্যও ছিলো মাটি ও প্রকৃতির নিবিড় নিকটবর্ত্তী।...

একদিন আদিম সাম্যবাদী সমাজ শিকারজীবন অতিক্রম করে প্রবেশ করলো কৃষি জীবনে। শস্য-শ্যামলে ভরে তুলল পলির নন্দনমাখা ভূমি। তারপর একদিন সে সাম্যবাদী সমাজ বিভাজিত হলো নানা শ্রেণী ও বর্ণে। ব্যক্তিমালিকানায় আক্রান্ত হয়ে কেউ কেউ পরিণত হলো দখলদারে। একের পর এক দখল করতে লাগলো সে পলির নন্দনমাখা ভূমি। শুধু ভূমি নয়, দখল হলো নদীও। এভাবে কত নদীর নিজস্ব নাম বদলে এখন পরিণত হয়েছে দখলিয়া নদী নামে— তা কম বেশি বিশ্বের অনেক মানুষই জানেন।...

একদিন আমাদের উৎপাদনকারী সমাজ ছিলো সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর সমাজ, তাই আমাদের আরাধ্যও ছিলো কৃষ্ণ বা শ্যাম। আর আমাদের সংস্কৃতি ছিলো কৃষিনির্ভর 'কৃষ্টি'। দূর বনের পাখিটি ডেকে ডেকে হয়তো সে কথাই স্মরণ করাতে চায়।... পাখিকে এখানে আমরা ইতিহাসের পাঠ বলে ধরে নিতে পারি। কবি আমাদের কৃষ্ণ> কৃষি> কৃষ্টির সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের শাব্দিক দৃষ্টান্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন, শব্দ তিনটির মূল ধাতু ‘কৃষ’কে পৃথক করে।...

আমাদের নির্ভরতা যদি কৃষি হয় তাহলে আমাদের জীবনাচার ও কৃষ্টি কৃষিকেন্দ্রিক— এটা স্বাভাবিক! কিন্তু আমাদের আরাধ্য কৃষ্ণ বলেই কি আমাদের নির্ভরতা কৃষি হয়েছে, নাকি নির্ভরতা কৃষি বলেই আরাধ্য কৃষ্ণ হয়েছে— তা ভাববার অবকাশ আছে।... কারণ কৃষ্ণ শব্দটি এখানে প্রথমে নির্দ্দেশ করা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, কবি যদি শুধু শাব্দিক সম্পর্ক নির্দ্দেশ করে থাকেন তা হলে ক্রমিকতায় তেমন কোনো সমস্যার কথা নয়।

আহা! কৃষ্ণ কোথায় রে? রাধা ধারাপাত পড়ে, লাঙ্গলের… রাধাকে ছেড়ে ব্রজবিহারী কৃষ্ণ চিরদিনের জন্য চলে গেছে মথুরায়। তাই কৃষ্ণ নামে আহাজারি ব্যতীত রাধার আর কোনো পথ নাই। কিন্তু কথা হচ্ছে, রাধা লাঙ্গলের ধারাপাত পড়ছে কেনো?!…

আমরা এতক্ষণ কৃষ্ণকে শুধু শ্যাম বলে জেনেছি। কিন্তু কৃষ্ণের নাকি আরো একটি অর্থ আছে— নিষিদ্ধ পথে উপার্জ্জিত সম্পদ/ব্ল্যাক মানি/কালো টাকা। এখন পুরো কবিতাটাকে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হবে। কারণ এতোক্ষণ কৃষ্ণকে আমাদের বলে প্রচার করেছি এবং নিজেদেরকে আমরা উৎপাদনকারী কৃষিনির্ভর সমাজ বলে চিহ্নিত করেছি।…

ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি মতে, গোপসমাজ/গো-পালনকারী সমাজ হচ্ছে পণ্য উৎপাদনকারী এবং পণ্যবাহী সমাজ। রাধা শব্দের আদি রূপ নাকি ধারা বা পণ্য প্রবাহ। রাধার নাকি এমন অর্থও হয়— যে ধার করে।…

আমরা আগেও আলোচনা করেছি, ভারতীয় সমাজ সবসময় একই অবস্থায় ছিলো না। একেক সময়ে একেক প্রকার সামাজিক ব্যবস্থা চালু ছিলো ভারতে। সময়ে সময়ে পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার সাথে নানা সংগ্রাম-সংঘাত করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো নতুন সমাজ ব্যবস্থা। এসব সংঘাত-সংগ্রাম করার জন্য নারায়ণ কিংবা বিষ্ণুর দশ অবতারের আবির্ভাব হয়েছিলো দশটি বিশেষ কালের দশ রকম সমাজ ব্যবস্থার বিনাশকারী রূপে। বিষ্ণুর দশ অবতারের এক অবতার হচ্ছে কৃষ্ণ। একসময় নাকি বিষ্ণুর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। পরে নারায়ণ নিজেই বিষ্ণু রূপে পরিচিত হয়ে যায়। আর নারায়ণই (যার অর্থ পুঁজি কিংবা সম্পদ) বিষ্ণুর দশ অবতার হিসাবে আবির্ভূত হয়। অর্থাৎ পুঁজি বা সম্পদই দশটি রূপ পরিগ্রহ করে দশটি বিশেষ কালে উদয় হয়। যেমন— মৎস্য অবতার ব্যক্তি মালিকানা রূপে, বরাহ অবতার বিনিয়োগ রূপে প্রভৃতি।... এভাবে বিষ্ণুর বা সম্পদের কৃষ্ণ-অবতার হয় কালো পুঁজি বা কালো সম্পদ রূপে! এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, কৃষ্ণের জন্ম ও জীবন নিয়ে প্রান্তিক সমাজে অনেক মতভেদ আছে।... অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করে, মহাভারতের বাসুদেব কৃষ্ণ এবং ভাগবত ও সাহিত্য গ্রন্থাদির কৃষ্ণ এক ব্যক্তি নয়। পণ্ডিতদের মাঝে এ ব্যাপারে যতোই মতভেদ থাকুক, ভারতীয় সমাজ কিন্তু দুই কৃষ্ণকে একাকার করে নিজেদের মতো করে কৃষ্ণকে গ্রহণ করে নিয়েছে।... কৃষ্ণের আবির্ভাবের পূর্ব্বেই সমাজে ব্যক্তিমালিকানা ও ব্যক্তিপুঁজির উদ্ভব হয়, গড়ে ওঠে রাষ্ট্রব্যবস্থাও। আর সে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চালু ছিলো কর আদায়ের রীতি। সমাজে তখন শ্রমবিভাজনও প্রচলিত ছিলো। আবার বিনিময় প্রথাও গড়ে ওঠেছিলো। উৎপাদনকারীদের উৎপন্ন দ্রব্য ব্যবসায়ী সমাজ ক্রয় করে আবার তা ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতো। আর রাষ্ট্রযন্ত্র সবার উপার্জ্জন থেকে কর আদায় করতো। একসময় কর সংগ্রহকারী রাষ্ট্রযন্ত্রের কর নির্দ্ধারণের হার এতোই বেড়ে যায় যে, ব্যবসায়ী সমাজ সে কর আদায় করতে গিয়ে নিজেদের উপার্জ্জিত সন্তান বা সম্পদের সবটাই হারাচ্ছিলো। তাই বাসুদেব বা ব্যবসায়ীরা জন্ম দেয় কৃষ্ণকে। অর্থাৎ তারা কর ফাঁকি দিয়ে গড়ে তোলে কৃষ্ণধনকে বা কালো সম্পদকে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখ রাঙানির কারণে নিজ পুত্র কৃষ্ণকে বাসুদেবের নিজের কাছে রাখা সম্ভব হলো না। শিশু কৃষ্ণকে পাঠিয়ে দেয়া হলো বন্ধু নন্দগোপের কাছে, যার কাছ থেকে বাসুদেব উৎপাদিত দ্রব্য ক্রয় করে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতো।

নন্দ যশোদাদের গোপ সমাজে গিয়ে কৃষ্ণ উৎপাদনকার্য্যে ব্যবহৃত হয়ে দিন দিন বড় হতে লাগলো। শিশু অবস্থাতেই কৃষ্ণ নানা লীলা প্রদর্শন করে উৎপাদন বাড়িয়ে গোপ সমাজকে অবাক করে দিলো। যৌবনে কৃষ্ণ কালা ব্রজবিহারী হয়ে রাধার সাথে মাতলো রাস লীলায়। এ সেই রাধা, যে রাধা স্বয়ং লক্ষ্মী, যে লক্ষ্মী স্বয়ং সতী দেবী। গোপ সমাজে জন্ম নিয়ে লক্ষ্মী হলো রাধা, যে রাধার নিজস্ব পুঁজি ও উৎপাদনযন্ত্র না থাকায় অর্থাৎ স্বামী নপুংশক হওয়ায় উৎপাদনকার্য্যের জন্য ধার করতে হতো পুঁজি বা যন্ত্র। এমনও হতে পারে যে, রাধাদের নিজস্ব কোনো উৎপাদন ক্ষেত্রই ছিলো না তাই অন্যের উৎপাদন কার্য্যে শ্রম দিয়ে তাদের উপার্জ্জন করতে হতো। গোপ সমাজে হয়তো কৃষ্ণকে নিজের উৎপাদন কার্য্যে নিযুক্ত করার কোনো অধিকার ছিলো না রাধার, নিজের একেবারে কিছুই না থাকায়— সম্পদ কিংবা ব্যবসাক্ষেত্র অথবা উৎপাদনক্ষেত্র দেখাতে না পারলে আজকে যেমন ঋণ নেওয়ার অধিকার থাকে না। কিন্তু কৃষ্ণ সে রীতিকে ফাঁকি দিয়ে রাধার সাথে লীলা করলো। এক সময় কৃষ্ণ তার কাঙ্খিত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য গোকুল ত্যাগ করলো। এখন লক্ষ্মী/রাধা পুনরায় হয়ে পড়লো লাঙ্গল (উৎপাদন যন্ত্র)হারা, পুঁজি হারা। তাই প্রান্তিক উৎপাদনকারী রাধা এখন কৃষ্ণ কৃষ্ণ করে আত্মহারা, লাঙ্গলের ধারাপাত পড়ছে, উৎপাদন যন্ত্রের জন্য বিলাপ করছে— আহা! কৃষ্ণ কোথায় রে?...

অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা 'গাজী ভঙ্গি শাহ’ এর পর্য্যালোচনা

বাবা, ভঙ্গি শাহ!
কী এমন ভঙ্গিমায় দর্শন করিলা, রহস্যপৃথিবী? ....
বটতলি জংশনে রয়েছো দাঁড়িয়ে, ঠাই।
ঝিকঝিক, ঝিক ঝিক, ঝিকিঝিকি, ঝিক ঝিক.... রেলগাড়ি চলে যায়! ...
রেললাইনটি মিশেছে রেললাইনটির মাঝে,
আরেকটি রেললাইন চেয়ে আছে! রেলগাড়ি চলে যায় দিগন্তের দিকে.............
সময়ের পটভূমিকায় কেবলই জংশন, পথে পথে
নামে পুরোনো মানুষ,
নতুন মানুষে, নতুন যাত্রায়, নতুন মাত্রায়,....
বাবা,
যাহা দেখলাম
ফুল ফোটার সৌন্দর্য্যে দেখলাম,...
সকল সৌন্দর্য্য তাহাদের, যারা, অজস্র সৌন্দর্য্যে ফুটছেন,
আর
যারা দেখছেন,...
জীবন— দেখার ও ফোটার, ফোটার ও দেখার ভঙ্গিমা— ধারণার সংঘাত!
গাজীর উদ্যানে
ধারণা লড়ছে, ধারণার সাথে, ফোটার সৌন্দর্য্যে!
কোন জনা
কী এমন ভঙ্গিমার ইশকুলে
দেখছে আমাকে?
ফুটুক ফুটুক মনে। আমার, এবেলা ফুটিতে নেই! কলি ফুটিতে চাহে ফুটে না!.......

     গাজী ভঙ্গি শাহ // আরণ্যক টিটো





একটি আধ্যাত্মিক মরমী দর্শনের নাম সুফিবাদ। প্রেমে… ভাবে… সদা সর্ব্বদা উদ্বেলিত সুফি দরবেশদের অন্তরাত্মা। ভারতীয় অন্যান্য তান্ত্রিক যোগীদের মতো সুফি দরবেশদেরও রয়েছে ধ্যান, ন্যাস, প্রাণায়ামসহ সাধন পদ্ধতির নানা ধাপ ও ধরণ। যেগুলো যিকির, ফিকির, মুরাকাবা, মুশাহেদা, কাশফ, জজবাসহ নানা নামে পরিচিত।… বাহির থেকে সুফি দরবেশদের জীবনকে সাধন পদ্ধতির নির্দ্দিষ্ট বেড়াজালে আবদ্ধ এবং একঘেঁয়ে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে জীবনের পূর্ণ বিকাশের প্রশ্নে তারা একেবারে উদার। প্রেম এবং ভাব তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে যেমন উদার ও মানবিক করে তোলে তেমনি নানা মত ও চেতনার প্রতি করে তোলে সহনশীল। সাধনার কঠোর রীতি দ্বারা সংযত হলেও জীবন ও জগৎকে দেখার ক্ষেত্রে সুফি দরবেশরা বরাবরই প্রেমময়, উদার।...

এমনই একজন সুফি দরবেশ ‘গাজী ভঙ্গি শাহ’। চট্টগ্রামের বটতলি রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন তার মাজার। এই সুফি দরবেশকে নিয়েই ‘গাজী ভঙ্গি শাহ’ নামক কবিতা।

শুরুতেই একেবারে দরবারি ধাঁচের সম্বোধন, ‘বাবা ভঙ্গি শাহ’ বলে। তারপর লোকজ রিদমে বিষ্ময় প্রকাশ করা হয়েছে— সাধু পুরুষ কী এমন ভঙ্গিমায় এ রহস্যময় জগৎকে অবলোকন করেছেন! …

আমরা জেনেছি, সাধু দরবেশের নাম ‘ভঙ্গি শাহ’। অবশ্যই জীবন ও জগৎকে দেখবার ক্ষেত্রে তার একটি ভঙ্গি/স্টাইল/মতবাদ ছিলো। কিন্তু কৌতুহলের ব্যাপার হচ্ছে, ভঙ্গি শব্দের সাথে তার কী এমন সম্পর্ক ছিলো যার কারণে দরবেশের নাম হয়েছে সরাসরি ‘ভঙ্গি’?!…

বটতলি জংশনে ভঙ্গি শাহ দাঁড়িয়ে আছেন। প্রকৃতপক্ষে ভঙ্গি শাহ নন, তার মাজার দাঁড়িয়ে আছে। আবার তিনিও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। কারণ মারেফত সাধকদের মতে, সাধনার এক পর্যায়ে মৃত্যু সাধকের অধীন হয়ে যায়। যখন ইচ্ছা সাধক সমাধি অভ্যন্তর হতে সুক্ষ্ম দেহ ধারণ করতে পারেন। ভারতীয় তান্ত্রিক যোগীদের অষ্টসিদ্ধি ধারণা মতেও এমনটি সম্ভব।…

বহুবিধ অর্থময় দারুণ একটি চিত্রকল্প— ঝিক্ ঝিক্ ঝিকিঝিকি শব্দ তোলে রেল চলে যাচ্ছে। একটি রেললাইনের সাথে আরেকটি রেললাইন মিশে গেছে— আরেকটি রেললাইন চেয়ে আছেরেলগাড়ি চেয়ে আছে দিগন্তের দিকে।…

যদি চিত্রকল্পটি এভাবে ভাবা হয়, রেললাইনরূপি মানুষ মিলছে মানুষের সাথে। আবার মানুষকে ছেড়ে মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে। সময়ের রেল মানুষের সাথে মানুষকে মিলিয়ে দিচ্ছে আর মানুষের কাছ থেকে মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। না, এভাবে হচ্ছে না।…

ভাবা যায়, মহাকালের রেলপথে জংশনটা একটা নির্দ্দিষ্ট কালপর্ব্ব। সে কালপর্বে বিভিন্ন চিন্তা ও মতবাদের সমাহার। তার মধ্যে দুটি মতবাদ একে অপরের মধ্যে লীন হয়ে সমন্বয়বাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আরেকটি মতবাদ একা হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর এসব মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে রেলগাড়িরূপি মানুষের জীবন— পুরাতন চিন্তা ও পুরাতন মানুষ তো আছেই, নতুন চিন্তায় নতুন মানুষরাও নতুন মাত্রায় নতুন যাত্রাভিমুখে চলছে। …

এমনও ভাবতে পারি, একটার সাথে একটা মিশে যাওয়া রেললাইনের একটি মানবাত্মা, অপরটি পরমাত্মা আর তৃতীয় রেললাইনটি স্থুল দেহ। রেলগাড়িটি সত্ত্বার অনুভূতি আর জংশন হচ্ছে পূর্ণসত্ত্বা। স্থুল দেহের বন্ধন ছিন্ন করে মানবাত্মা পরমাত্মার সাথে মিলিত হওয়ায় পুরাতন মানুষই পরিণত হচ্ছে নতুন মানুষে, কাঁচা আমি থেকে পাকা আমিতে, পাচ্ছে নতুন মাত্রা। রেললাইনগুলোকে চাইলে আমরা মারেফত কিংবা তন্ত্রযোগের ভাষায় তিনটি নাড়ীও মনে করতে পারি। না, এদিকে যাওয়া ঠিক হবে না হয়তো।…

এবার কথক নিজের দেখার ব্যাপারে সাধক পুরুষকে জানাচ্ছে— (কথক) যা দেখেছে, ফুল ফোটার সৌন্দর্য্যে দেখেছে।... ফুল ফোটার সৌন্দর্য্যে দেখা ব্যাপারটি এখানে বহুরৈখিক ব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করে। আমাদের ভাবতে হবে, ফুল ফোটার সৌন্দর্য্যে দেখার তাৎপর্য্যটা কী?! এটা কি নিছক দেখার জন্য দেখা?! অর্থাৎ জীবন আছে বলে, যাপন করার মতো দৃষ্টি আছে বলে দেখা, নাকি এ দেখার সাথে জড়িয়ে আছে উপভোগ উপলব্ধির ব্যাপারও। এ কি নিষ্কাম কর্মের মতো দেখা, নাকি আবার বিশ্লেষণবাদী দর্শনের আত্মতৃপ্তির জন্য দেখা?! মনে হয়, এখানে দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশের বিষয়টি ইঙ্গিত করা হচ্ছে। কারণ একটু পরে সকল সৌন্দর্য্য তাদের বলে স্বীকার করা হচ্ছে যারা অজস্র সৌন্দর্য্যে বিকশিত হচ্ছে। অর্থাৎ যাদের চিন্তা ও জীবন সর্ব্বদা ফুলের ন্যায় বিকশিত।… সৌন্দর্য্য তাদেরও, যারা দেখছেন কিংবা উপলব্ধি করছেন— জীবনটা আসলে দেখার ও ফোটার, ফোটার ও দেখার ভঙ্গিমা আর ধারণার সংঘাত।…

সুন্দর এবং সৌন্দর্য্য নিয়ে প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক চলে আসছে সুদূর অতীত থেকে। কারো কারো মতে সুন্দর এবং সৌন্দর্য্য আসলে আপেক্ষিক।… কিন্তু তাতেই বিষয়টির একেবারে শেষ সুরাহা হয়ে যায় না।… সুন্দর এবং সৌন্দর্য্য যদি সরাসরি আপেক্ষিক হয় তাহলে যে কোনো মানুষ নিজের কোনো অসুন্দর জিনিসকে সুন্দর নাম জুড়ে দিয়ে তাকে সুন্দর বলে গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু আসলে তা কি সম্ভব?! তাহলে সুন্দর এবং সৌন্দর্য্যের সাথে মানব কিংবা মানবাত্মার কী এমন ঐন্দ্রজালিক সম্পর্ক তা আবিষ্কারের অপেক্ষা রাখে। তার আগে আমরা একেবারে যুক্তিবাদী যান্ত্রিক মানব হয়ে যেতে পারি না। যন্ত্রের মতো জীবনটাকে আমরা শুধু শুধু যাপন করতে পারি না, দরকার হয় ভাবাবেগের। তাই চিন্তাশীল মাত্রই মানবেন, জীবনটা যেমন উপলব্ধির তেমনি বিকাশের আবার তেমনি জীবন সম্পর্কিত নানা চিন্তা বা ধারণার, সংঘাতেরও।… গাজীর উদ্যানে নানান জাতের পুষ্প যেমন নিজ নিজ সৌন্দর্য্য নিয়ে প্রস্ফুটিত হচ্ছে তেমনি তাতে নানান চিন্তা মতবাদ কিংবা ধারণা নিজ সৌন্দর্য্যে একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে বিকশিত হচ্ছে।...

এখানে গাজীর উদ্যানটা গাজী ভঙ্গি শাহ’র মাজার প্রাঙ্গন হতে পারে, তার মানস জগৎও হতে পারে। আবার এটাকে যে কোনো মানবের চিন্তাজগৎও ভাবা যায়। ভাবা যায় সমগ্র মানব সমাজকেও। একজন মানুষের মানসজগতে যেমন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চিন্তা বা ধারণার জন্ম হয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের উদ্ভব হয় তেমনি মানব সমাজেও নানা জনের নানা চিন্তা বা ধারণার সাথে চলছে প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠার সংঘাত। সংঘাতে যে চিন্তা বা ধারণা বিজয়ী/গাজী হয়, তার উদ্যান বিজয়ীর উদ্যান/গাজীর উদ্যান!… গাজীর উদ্যান কি কোন খাদ্যশৃঙ্খল, যেখানে খাদ্য খাদকের মধ্যে চলছে প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, বিকাশের ধারা, টিকে থাকার যুদ্ধ যুদ্ধ আগ্রহ!? আর যে বা যারা টিকে থাকে, সে বা তারা গাজী। না, গাজীর উদ্যানটা আসলে দ্বন্দ্ব সংঘাতময় বিশ্ব। এখানে নানা মতবাদ মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে মানুষ জোটবদ্ধ/বিচ্ছিন্ন— মতাদর্শীর সাথে চলছে মতাদর্শীর সংঘাত। যেমন শান্তিবাদীরা লড়ছে সন্ত্রাসবাদীদের সাথে, প্রগতিবাদীরা লড়ছে মৌলবাদীদের সাথে, উদারবাদীরা লড়ছে কট্টরবাদীদের সাথে, সমাজতন্ত্রবাদীরা লড়ছে ধনতন্ত্রবাদীদের সাথে, বিকেন্দ্রবাদীরা লড়ছে কেন্দ্রবাদীদের সাথে। এভাবে চলছে নানান মতবাদের সাথে মতবাদের সংঘর্ষ, মানুষের সাথে মানুষের বিকাশের/প্রতিষ্ঠার সংঘাত। এখানে নিজের মতাদর্শ যার যার কাছে শ্রেয়। এখানে সংঘাতে বিজয়ীরা গাজী, বিজয়ীর মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্ম্ম, রীতি, নীতি, বিধান, সংবিধান হিসাবে!…

সমাজে একজন মানুষ সম্পর্কে কি আর অন্য সব মানুষের ধারণা এক হয়?! যে যার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একজন মানুষকে দেখে। তাই একজন মানুষ সম্পর্কে নানা জনের নানান ধারণা হতে পারে।… সমাজে কে কোন ভঙ্গিমায় আমাদের দেখছে তা আমাদের পক্ষে জানা হয়তো সম্ভব হয় না। কথকেরও একই অবস্থা— কোনজনা তাকে কোন ভঙ্গিমার মাপকাঠিতে দেখছে তা জানার অবকাশ নাই তার। কথকও চায়, সব ফুল ফুটুক সব ধারণা বিকশিত হোক।... কিন্তু কথক নিজে এ বেলায় ফুটবে না। রবীন্দ্রনাথের আন্তর্বয়ানে-কলি(?) ফুটতে চায় কিন্তু ফুটে না। তবে কেন, কোন সংশয়ে, সঙ্কোচে তা আমাদের জানা মুশকিল।...

অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা 'অভিবাসী মেঘ’ এর পর্য্যালোচনা

অভিবাসী মেঘ, তুমি কোথা যাও?
জলের ডানায় উড়ে উড়ে যাও কোন সে দূরের গাঁয়? ...
এইখানে এসো।
কাজলা দিঘীর জলে ভাসা
দলকলমির
পাপড়ির উপর চুপটি করে বসো। ...
অভিবাসী মেঘ, তুমি কোথা যাও?
এইখানে এসো।
শোনো, ধানক্ষেতের আড়ালে
কাঁদছে
সদ্যোজাত যিশু!
শঙখলা নদীটির নীড়ে, গণকবরের
সবুজ ঘাসের ফুলে ফুলে দিয়ে যাও জলজ পরশ!…
কাঁটাতার ঘেরা শ্যামল সবুজে,
পৃথিবীর
গাঁয়ের আকাশে,
মন পবনের নাঁয়ে ভেসে ভেসে যাও
কোন সে দূরের গাঁয়?
ভাসছি অকূলে, সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের নাঁয়!
অথই সমুদ্রে
আশার ছলনে ভাসে কৌটিল্য নগর, কী ভাবে বাহিব দাঁড় উজানিয়া টানে! ...
অভিবাসী মেঘ, আমাকেও নিয়ে যাও! ...
      অভিবাসী মেঘ // আরণ্যক টিটো





মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূতম’ কাব্যে বিরহী যক্ষ তার প্রিয়ার কাছে দূত হয়ে যাওয়ার মিনতি করেছিলো মেঘকে।... এরপর থেকেই নাকি ভারতীয় কাব্য সাহিত্যে চেতন অবচেতনের ব্যবধান অনেকটা রহিত হয়েছিলো। কালিদাসের ‘মেঘদূতম' ছিলো শৃঙ্গার রস প্রধান কাব্য। ‘মেঘদূত' শিরোনামে কবিতা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তবে তার কবিতাটির মূল প্রেরণা কালিদাসের ‘মেঘদূতম' এবং তাতে প্রাধান্য পেয়েছে করুণ রসের। এরপর বাংলা সাহিত্যে আরও অনেক কবির অনেক কবিতার নানান উপকরণ হয়েছে মেঘ। ‘অভিবাসী মেঘ’ নামক কবিতায় মেঘকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘অভিবাসী’ বলে।...

‘অভিবাসী’ আজকের বিশ্বের বহুল আলোচিত একটি শব্দ। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ আজকে অভিবাসী হয়ে কঠিন করুণ মর্ম্মান্তিক পরিণতির শিকার হচ্ছে। আবার অনেক রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ত্তাব্যক্তিদেরও মাথাব্যথার শেষ নেই অভিবাসন সমস্যা নিয়ে। যেমন মধ্য এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অভিবাসন প্রত্যাশী লোকদের নিয়ে ইউরোপের অনেক রাষ্ট্র এখন দিশেহারা।...

পৃথিবীতে রাষ্ট্র উদ্ভবের পূর্ব্বে অভিবাসী বা অভিবাসন সমস্যাটি হয়তো ছিলো না। তখন মানুষ তার সাধ্যমতো এ গ্রহের যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারতো। এতে প্রয়োজন হতো না কারোর সম্মতি কিংবা কোনো পাসপোর্ট ভিসার। কিন্তু রাষ্ট্র উদ্ভবের পরে মানুষের সে স্বাধীনতা খর্ব্ব হয়ে যায়। পৃথিবীর পথে পথে গড়ে ওঠে নিষেধের প্রাচীর, কাঁটাতারের বেড়া। রুটিরোজগারের জন্য হোক অন্য কোনো কারণে হোক, এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রে বসবাস কিংবা অবস্থান করতে কর্ত্তৃপক্ষের অনুমতির রীতি গড়ে ওঠলো। কর্ত্তৃপক্ষের সম্মতিহীন কিংবা সম্মতির মেয়াদোত্তীর্ণ লোকদের বলা হলো, অবৈধ অভিবাসী কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। যাদের ওপর যে কোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে রাষ্ট্রপক্ষের কঠিন কঠোর নির্দ্দয় দমন অভিযান।...

এমনও দেখা যায় যে, কোনো আক্রান্ত দেশের নাগরিকদের পার্শ্ববর্ত্তী রাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়া হয় শরনার্থী নামে। শরনার্থী হোক, অভিবাসী হোক কিংবা অভিবাসন প্রত্যাশী হোক পৃথিবী নামক গ্রহটিতে তারা মূলত পরবাসী/পরদেশী/পরগ্রহী। কারণ তাদের জীবন জ্বলন্ত খাণ্ডব আর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, আইনের বিষাক্ত বলয়— এপারে থাকা তাদের দুঃসহ, ওপারে যাওয়া দুরাশা। এমনই কাঁটাতারের রীতি, এমনই সীমান্ত আইনের শাসন।…

ভারতীয় পুরাণে নাকি ডানাওয়ালা হাতির উল্লেখ আছে। আকাশে উড়ন্ত যে হাতি একদিন কোনো এক দেবতার অভিশাপে পাখা হারিয়ে মর্তের বর্ত্তমান হাতিতে পরিণত হয়। তাই প্রাচীন ভারতীয় অনেক সাহিত্যগ্রন্থে উড়ন্ত মেঘকে হাতির সাথে তুলনা করা হয়েছে। মেঘের ডানা কল্পনা করার ব্যাপারটি তখন থেকেই হয়তো ভারতীয়দের মাথায় আসে। বাংলা সাহিত্যের যত্রতত্রই মেঘের ডানার কথা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু অভিবাসী মেঘের কথা অর্থাৎ মেঘকে অভিবাসী বলে কেউ পূর্ব্বে কল্পনা করেছে কী না তা আমরা জানি না! মেঘ 'অভিবাসী' হলেও অভিবাসী মানুষের মতো দুর্দ্দশা/সীমাবদ্ধতা হয়তো তার নেই। পৃথিবীর আকাশে জলের ডানায় উড়ে উড়ে যেতে পারে দূর দূরান্তে। তাই অভিবাসী মেঘের প্রতি কথকের আহ্বান, যেন সে কাজলা দিঘির জলে ভাসা দলকলমির পাপড়ির উপর চুপটি করে বসে কথকের কথা শোনে। মেঘ যেন ধানক্ষেতের আড়ালে ক্রন্দনরত সদ্যোজাত যিশুর কাছে আসে।

ধানক্ষেতের আড়ালে/ কাঁদছে/ সদ্যোজাত যিশু— চরণটিতে অতিশয়োক্তি অলঙ্কারের প্রয়োগ করা হয়েছে। উপমেয় শিশু অনুপস্থিত— উপমান যিশু। এখানে শিশু এবং যিশুর মধ্যে কী রূপ অভেদত্ব নির্ম্মিত হয়েছে তা বোঝার জন্য আমাদের 'অভিবাসী' শব্দের সূত্র ধরে সাম্প্রতিক বিশ্বের ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর দিতে হবে। সমুদ্র সৈকতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শিশু আইলানের সে মর্ম্মান্তিক ছবিটি এত শীঘ্রই বিশ্ববাসীর হৃদয় থেকে মুছে যাবার কথা নয়। মাত্র কয়েক মাস আগে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশকারী একটি রোহিঙ্গা বোটে পাওয়া গিয়েছিলো একা একটি দেড়মাস কী তিন মাসের কন্যা শিশুকে। তাছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রত্যাশী লোকদের সাথে অনেক শিশুকে কাঁটাতারের বেড়া ধরে কাঁদতে দেখা গিয়েছিলো অনাহারে অর্দ্ধাহারে। এসব শিশু কি একটি রাষ্ট্রের কাছে পিতৃহীন কুমারী মাতার সন্তান যিশুর সমতুল্য নয়?! হয়তো একটু তফাত আছে— যিশু ছিলো জন্ম পরিচয়ের অভিবাসী আর এসব শিশুরা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অভিবাসী। এ তো গেলো চরণটির সাম্প্রতিক উপযোগিতা। সর্ব্বকালের উপযোগিতাটা তাহলে কোথায়?…

আমাদের দেশে এমন অনেক ঘটনা জানা যায় যে, পিতৃপরিচয়হীন অনেক কুমারী মায়ের কিংবা বারাঙ্গনাদের সন্তানকে ফেলে যাওয়া হয় ধানক্ষেতের আইলে ঝোপে ঝাড়ে নালায় ডাস্টবিনে।… সে-ও কি যিশুর মতো জন্ম পরিচয়ের ‘অভিবাসী’ নয়?!

পরের চরণে মেঘকে আহ্বান করা হচ্ছে— শঙখলা নদীটির নীড়ে গণকবরের সবুজ ঘাসের ফুলে ফুলে জলজ পরশ দিয়ে যাওয়ার জন্য।...

থাইল্যাণ্ডের একটি নদীর নাম শঙখলা। অনেকে হয়তো জানেন, এই নদীর তীরবর্ত্তী দূর্গম জঙ্গলে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের অসংখ্য অভিবাসন প্রত্যাশী মানুষের কবর আবিস্কৃত হয়েছিলো। যাদের অনেকের মৃত্যু হয়েছিলো সমুদ্রে নৌকায় ভেসে ভেসে ক্ষুধায় পিপাসায় রোগে ভোগে। সেই তৃষ্ণার্ত্ত মানুষগুলো'র কবরে জন্মানো ঘাস, ঘাসফুল সবই কি তৃষ্ণার্ত্ত মনে হয় না?!…

এখানে শঙখলা নদীর নাম উল্লেখিত হয়ে যেমন মালেশিয়ায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের গণকবরের কথা স্মরণ করাচ্ছে তেমনি ঐতিহাসিক কাল ধরে পৃথিবীর বুকে আবিষ্কৃত অনাবিষ্কৃত গণকবরের কথা স্মরণ করাচ্ছে। যেমন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা, প্রথম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা, বর্ত্তমানে মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকায় যুদ্ধাক্রান্ত অঞ্চলগুলিতে সংঘটিত গণহত্যা।… 'নীড়ে' শব্দের পরে কমার ব্যবহার চরণটিকে 'গণকবর' বিষয়ক অর্থ বিস্তৃতি দিয়েছে।

কাঁটাতার ঘেরা শ্যামল সবুজ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর গাঁয়ের আকাশে মন পবনের নাঁয়ে ভেসে মেঘ যাচ্ছে কোনো এক সুদূর গাঁয়ের পারে। কিন্তু কথকের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। কথক সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়ে ভাসছে অকূলে। অথই সমুদ্রে আশার ছলনে ভাসছে কৌটিল্যনগর। আর কথক সন্ধিগ্ধ হয়ে পড়ছে নৌকার প্রতি।...
সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়ের সাথে কৌটিল্য বা কৌটিল্যনগরের উল্লেখ ব্যাপারটিকে অনেক তাৎপর্য্যময় করে তোলেছে। কৌটিল্যের সাথে সপ্তাঙ্গতত্ত্বের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত কূটনৈতিক ধর্ম্মতাত্ত্বিক পণ্ডিত কৌটিল্য। ইতিহাসে তিনি চাণক্য নামে অধিক পরিচিত। রাজনীতি বিষয়ক তার বিখ্যাত গ্রন্থটি ‘চাণক্যের অর্থশাস্ত্র’ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ক প্রধান সাতটি নীতির কথা বলেন। আধুনিক রাষ্ট্রের উপাদান— ভূখণ্ড, জনগণ, সরকার, সার্ব্বভৌমত্ব কিংবা রাষ্ট্রের অঙ্গ— আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মতোই অর্থশাস্ত্র'র সাতটি নীতি কৌটিল্য প্রণীত রাষ্ট্রব্যবস্থার সপ্তাঙ্গ!...

কথকের সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়ে ভাসা এবং আশার ছলনে ভাসা কৌটিল্যনগর— কথাগুলো আমদের আরো একটু পরিষ্কার করে নিতে হবে।…

একথা সর্ব্বজন সম্মত যে, রাষ্ট্রীয় আইনের মতো রাষ্ট্রের সীমান্তপ্রাচীর রাষ্ট্র এবঙ রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনগণের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রে যখন নেমে আসে উচ্ছেদ অভিযান, যুদ্ধ, মহামারি, উপার্জ্জনের অনিশ্চয়তা কিংবা কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ তখন সে রাষ্ট্র অথবা পার্শ্ববর্ত্তী রাষ্ট্রের কাঁটাতার কিংবা সীমান্ত আইন আক্রান্ত জনগণকে কি অকূলে ভাসিয়ে রাখবে না? যেমনটি আমরা ভাসতে দেখেছি মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বঙ্গোপসাগরে, মায়ানমার ও বাংলাদেশের অনেক মানুষকে মালেশিয়া থাইল্যাণ্ডের উপকুলে এবং লিবিয়া সিরিয়া ইরাক মিসরসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভূমধ্য সাগরে কিংবা ইউরোপের উপকুলে। অভিবাসন প্রত্যাশী ভাসমান মানুষগুলোও স্বপন দেখে কৌটিল্য প্রণীত রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের!…

তাই অভিবাসী মেঘের কাছে কথকের মিনতি— মেঘ যেন কথককেও নিয়ে যায় সাথে...
এখানে সপ্তাঙ্গতত্ত্বের নাঁয়, আশার ছলনা, দাঁড়, উজানিয়া টান প্রভৃতি শব্দবন্ধের আধ্যাত্মিক তান্ত্রিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। না, ওদিকে আমরা যাবো না।...

মেঘদূতম্ কাব্যে মেঘকে আহ্বান ছিলো এক প্রকার রতিসুখের প্ররোচনা এবং কাব্যের অধিকাংশ চিত্রকল্পও ছিলে শৃঙ্গার সমৃদ্ধ। কিন্তু ‘অভিবাসী মেঘ’ কাব্যে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয় এবং চিত্রকল্প মর্মান্তিক হৃদয় বিদারক। তাই এখানে করুণ রসই প্রধান হয়েছে। অভিবাসী মেঘে যে ধ্বনি বা সুর মাধুর্য্য গড়ে উঠেছে তা কবিতার করুণ আবেদনকে দিয়েছে আরও গভীর বিস্তৃতি।…

অভিবাসী মেঘ শুধু সাময়িক কিছু ঘটনার বিবরণ নয়, তা সর্ব্বকালের কিছু দুর্দ্দশাগ্রস্থ মানুষের মর্ম্মান্তিক পরিণতির লেখচিত্র।…


অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা 'পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা’ এর পর্য্যালোচনা


পাসওয়ার্ডে
তোমার নামের স ব ক টি
বর্ণে
রূপ রস গন্ধে …
ওপেন করি, ওয়েব পোর্টাল, দিগন্তের পাতা! …
কী-পেডে
মিতালিমুখর (তোমার নামের)
স ব ক টি বর্ণে জপি, নামসংকীর্ত্তন! …
প্রিয় জপমালা
প্রিয়
তসবিহদানা
প্রিয়
(তোমার নামের) স ব ক টি
অক্ষরের
নির্জন স্বাক্ষর,
উন্মোচিত পটভূমি,
ডব্লিওডব্লিওডব্লিও.সবুজপাতা.কম! …………
প্রিয়
পাসওয়ার্ড আমার
প্রিয় আরাধনা, সর্ব্বসুন্দরম্! …
পরশনে জীবনযাতনা! …
কী-পেডে
মিতালিমুখর (তোমার নামের)
স ব ক টি বর্ণে ছড়িয়ে পড়ছি দিগ্-বিদিগ্
দরশনে! …

      পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা // আরণ্যক টিটো




কবিতার নাম পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা। এখানে লেখার একটি বিশেষ রীতি প্রয়োগ করে পাসওয়ার্ড, জপমালা ও তসবিহদানা শব্দ তিনটির মধ্যে একটির সাথে অপরটির সম্পর্ক নির্দ্দেশ করা হয়েছে। সাধারণত আমরা জানি, জপমালা এবং তসবিহদানা শব্দ দুটির মধ্যে এক প্রকার ব্যবহারিক সম্পর্ক রয়েছে। একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ঈশ্বর বা হরি নাম জপ করার জন্য জপমালা ব্যবহার করেন। আর একজন মুসলিম আল্লাহ বা খোদার নাম জপার জন্য তসবিহদানা ব্যবহার করেন। সুতরাং দুটি বস্তুই একই ধরণের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু জপমালা এবং তসবিহদানার সাথে পাসওয়ার্ড শব্দের কতোটা সাদৃশ্য তা আমাদের একটু ভেবে দেখতে হবে।…

পাসওয়ার্ড একটি ভার্চুয়াল শব্দ। নিজস্ব ওয়েব/একাউন্ট/আইডি সংরক্ষণ এবং গোপনীয়তার জন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়। পাসওয়ার্ড হচ্ছে মূলত ভার্চুয়াল জগতের কাঙ্খিত স্থানের চাবিকাঠি।…

আমরা আগে বলেছি, একজন ঈশ্বর প্রেমিক অথবা খোদা প্রেমিক জপমালা ও তসবিহদানার মাধ্যমে প্রেমাস্পদ খোদার/ইশ্বরের নাম জপ করে। কিন্তু যদি প্রেমাস্পদ হয় কৃষ্ণ কিংবা লাইলী, তাহলে প্রেমিক কী করবে?! আমাদের জানা, আছে প্রেমাস্পদ লায়লী হলে প্রেমিক নজদবনে তড়পায় আর প্রেমাস্পদ কৃষ্ণ হলে প্রেমিক বৃন্দাবন কিংবা যমুনা কূলে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে আহাজারি করে।… এখন আজকের কোনো প্রেমিক যদি নিজের প্রেমাস্পদের নামটিকে নিজের ওয়েব পোর্টালের পাসওয়ার্ড বানিয়ে রাখে আর এই পাসওয়ার্ড জপে জপে যদি আত্মদর্শন হোক, ওয়েব পোর্টাল দর্শন হোক কিংবা দিগন্ত দর্শনে মগ্ন হয়, তাহলে পাসওয়ার্ড কি শুধুমাত্র পাসওয়ার্ড থাকবে?!…

একজন বৈষ্ণবের কাছে যেমন নাম এবং নামী/ব্যক্তি অভিন্ন তেমনি পাসওয়ার্ড কি এখানে প্রেমিকের প্রেমাস্পদ কিংবা প্রেমাস্পদের আরাধ্য নাম হতে পারে না?! আর পাসওয়ার্ড যদি প্রেমাস্পদ কিংবা প্রেমাস্পদের নাম হতে পারে তবে জপমালা ও তসবিহদানার সাথে পাসওয়ার্ডের সাদৃশ্য অবশ্যই থাকতে পারে। তাই প্রেমিক পাসওয়ার্ডে প্রেমাস্পদের নামের সবকটি বর্ণে রূপ রস গন্ধে... ওয়েব পোর্টাল/দিগন্তের পাতা ওপেন করছে।… এখানে ‘স ব ক টি’ শব্দের প্রত্যেক বর্ণ আলাদা করে লিখে পাসওয়ার্ড শব্দটিকে হয়তো আরও গভীর ব্যাপ্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পাঠকালে যেন পাসওয়ার্ডের একেকটি ডিজিটের কথা মননে নাড়া দেয়। তাছাড়া বর্ণ, রূপ, রস, গন্ধ শব্দগুলো নাম শব্দ পাসওয়ার্ডের নামীর/ব্যক্তির কথা ইঙ্গিত করছে। আবার প্রেমাস্পদের মিতালিমুখর সবকটি বর্ণ বলতে পাসওয়ার্ডের ডিজিটগুলোর মিতালি যেমন স্মরণে আসে তেমনি মিতালিমুখর শব্দটি নাম জপের মাধ্যমে প্রেমাস্পদের সাথে মিলনের একপ্রকার বাঙ্ময় ভাবের সৃষ্টি করছে।

নাম সংকীর্ত্তন শব্দদ্বয়ে একটু বাহুল্যতা রয়েছে— বৈষ্ণব মাত্রই জানেন: কীর্ত্তন দু’প্রকার (১) লীলা কীর্ত্তন, (২) নাম কীর্ত্তন। দ্বিতীয় নাম কীর্ত্তনকে আবার সংকীর্ত্তনও বলা হয়। তাই নাম সংকীর্ত্তন না বলে শুধুমাত্র সংকীর্ত্তন বললেও একই অর্থ প্রকাশ পেতো। তবে এখানে নাম শব্দটি সংকীর্ত্তন পূর্ব্বে বসে এক প্রকার সুর-সমতা রক্ষা করেছে।

পাসওয়ার্ডের সবকটি ডিজিট বা প্রেমাস্পদের নামের সবকটি অক্ষর হচ্ছে প্রেমাস্পদের স্বাক্ষর। এখানে অক্ষর একত্রিত হয়ে শুধুমাত্র স্বাক্ষর রচিত হয়নি, স্বাক্ষর শব্দটি নামীর/ব্যক্তিরও ইঙ্গিত ধারণ করেছে। নাম যেমন স্বাক্ষর তেমনি নামী, আবার তেমনি উন্মেচিত পটভূমিও। উন্মেচিত পটভূমি— কথাটি প্রেমিকের প্রেমকে বিশেষ থেকে নির্বিশেষের দিকে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ পার্থিব জগতের মধ্য দিয়ে প্রেমিক দিব্য জগতে প্রবেশ করছে।…

বিভিন্ন রকম শব্দ চয়নে একেক কবিতায় একেক রকম গীতিময়তা সৃষ্টির এক বিশেষ কৃতিত্ব দেখাতে সক্ষম কবি। তার কবিতায় তৎসম তদ্ভব খাঁটি বাংলা আরবি ফারসি ইংরেজি নানা জাত শব্দ একসাথে ব্যবহৃত হলেও কবিতার মূল সুর বা গীতলতা কোথাও লঙ্ঘিত হয় না। এখানে পাসওয়ার্ড শব্দটি যেমন ইংরেজি শব্দ হওয়া সত্ত্বেও কোমল গীতলতা সৃষ্টিতে কোনও বিঘ্নতা ঘটায়নি তেমনি ডব্লিওডব্লিওডব্লিও.সবুজপাতা.কম— এরূপ একটি ভার্চুয়াল বাক্য কবিতার মূল সুরে কোন প্রকার ব্যত্যয় ঘটায়নি।

পাসওয়ার্ড প্রেমিকের যেমন প্রিয় নাম তেমনি আরাধনা, তেমনি আবার সর্ব্বসুন্দরও, যার পরশন যাতনাময়। এ যেন পাওয়া না পাওয়ার আনন্দ-বেদনা।… প্রেমাস্পদের নামের সবকটি বর্ণে কথক নিজেই ছড়িয়ে পড়ছে দিগ্-বিদিগ্ দরশনে। নামের সবকটি বর্ণে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটি আমরা বৈষ্ণব এবং সুফিদের প্রেমাস্পদকে নিজের সত্ত্বায় অনুভব করার সাথে মিলিয়ে নিতে পারি আর দিগ্-বিদিগ্ দরশনের ব্যাপারটি একইভাবে প্রেমাস্পদের পরম সত্ত্বার মাঝে মিশে নিজেকে সর্ব্বময় সত্ত্বা বলে অনুভব করা ধরে নিতে পারি।…

এ পর্যন্ত যা আলোচনা করা হলো তা আধ্যাত্মিক মরমীয়া প্রেমের বোধ, উপলব্ধি।...
সাধারণ পার্থিব প্রেমের ভাষায় বলতে গেলে বিষয়টি দাঁড়াবে, একজন প্রেমিক তার প্রিয় মানুষটির নামটিকে ওয়েব পাসওয়ার্ড করে নিয়েছে। কী-পেডে একটির পর একটি ডিজিট বা বর্ণ ক্লিক করে নিজের ওয়েব ওপেন করছে। আর সে নামের মধ্য দিয়েই ইন্টারনেটে/আন্তর্জালে কথক ছড়িয়ে পড়ছে নানা দেশের নানান লোকের মাঝে এবং তাতেই সে পেয়ে যাচ্ছে দিগ্-দিগন্তের প্রতিবেশ-পরিবেশের সাক্ষাৎ।...

কথকের কাছে প্রিয় মানুষের নামে বানানো পাসওয়ার্ডটিও সে মানুষের মতোই প্রিয়। তাই জপমালা তসবিহদানার সাথে পাসওয়ার্ডটির সে সাদৃশ্যবোধ অনুভব করে। সেই প্রিয় পাসওয়ার্ড সবকিছুকে তার কাছে সুন্দর করে তোলে। আর সে সুন্দরের আবহ দৃষ্টিতে নিয়ে সে দিগবিদিগ দরশন করে।…

এভাবে পাসওয়ার্ড > জপমালা > তসবিহদানা কবিতায় বিচিত্র শব্দ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নানান রকম ভাবের গাঁথুনির মাধ্যমে পুরো কবিতায় একটি নিটোল ভাব সৌন্দর্য্য এবং সুর মাধুর্য্য গড়ে ওঠেছে, যা পূর্ণ গভীর এবং মরমীয়া।…

Monday, October 28, 2019

অর্দ্ধনারীশ্বরবাদী কবিতা '(উদ্)যাপনের কথামালা’ এর পর্য্যালোচনা

একটু পিছাতে চাই/ পরাণ কথার নীড়ে/…
গতির লালিত্যে/
ধনুক
যে ভাবে বেঁকে যায়/ পিছনের দিকে/…
কৃষ্ণকালা জানে/
পৃথিবীর কুরুক্ষেত্রে/
অর্জ্জুনের/
পশ্চাদগমনে লুকায়িত ছিলো/ মহাবীর/ কর্ণবধ /…
একটু পিছাতে চাই/ অন্ত্যজ মাটির কাঁচাসোনায়/ জেনে নিতে কর্ণের বেদনা/…
টা ন টা ন /
ধনুকের ছিলাময়/
বুড়ো আঙুলের ইতিহাসে/ মর্ম্মের পোড়নে জেগে ওঠে একলব্যবিশ্ব/…
প্রাসাদের ভারবহ/
ক্ষমতা কেন্দ্রের খুঁটি/ মধ্যবিন্দু ছেড়ে/
নতুন সৌন্দর্য্যে সরে যায়/ প্রান্তরের দিকে/…
একটু পিছাতে চাই/ পরাণ কথার নীড়ে/
খনার
কর্ত্তিত জিহ্বা জানে/
কথার মালায় রচা / বিনিসুঁতো মালা/ নিবিড় বন্ধনে বাঁধে/
(উদ্)যাপনের কথামালা/…

        (উদ্)যাপনের কথামালা // আরণ্যক টিটো



কেউ পিছায় নিচক পিছানো কিংবা পলায়নের জন্য। আবার কেউ পিছায় অগ্রগামী হবার জন্য কিংবা দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। পিছানো একধরণের ছলনা হতে পারে, হতে পারে যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলও।… তাহলে পশ্চাৎগমন মানে শুধুমাত্র পলায়নপরতা নয়, এর নেতিবাচক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি অনেক ইতিবাচক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।… এমনি একধরনের পিছানোর কথা বলা হয়েছে ‘(উদ্)যাপনের কথামালা’ কবিতায়।…

বেঁকে যাওয়া ধনুকের মতো কথক একটু পিছাতে চায় পরাণ কথার নীড়ে।... গতির লালিত্য সৃষ্টির জন্যই পিছনে বেঁকে যায় ধনুক আর কথক পিছাতে চায় পরাণ কথার নীড়ে।…
পরাণ কথার নীড় বলতে এখানে কী বুঝানো হচ্ছে? পরাণ কথার নীড় কি কথকের উৎসমূল, ইতিহাস-ঐতিহ্য, গৌরবের ভিত্তি কিংবা ব্যর্থতার সূচনাগার? হতে পারে নিজের অতীত মাত্র। যাই হোক না কেন, পরাণ কথার নীড়ে ভর দিয়েই কথক তরান্বিত করবে অগ্রগতি, শুধরাবে পূর্ব্বজ'র ভুল, ছুঁড়বে নিশানা।… কথকের পিছানো, ধনুকের বেঁকে যাওয়া, গতির লালিত্য, এসব তথ্যকে বাঁর্গসীয় গতিতত্ত্বের আলোকেও পাঠ করা যেতে পারে। (.........................)

কূটনৈতিক সারথি শ্রীমান কৃষ্ণ জানতেন, কৌরব পক্ষের দেবব্রত ভিষ্ম, গুরু দ্রোনাচার্য্য ও মহাবীর কর্ণের মতো যোদ্ধাদের সোজাপথে ধরাশায়ী করা যাবে না। তাই তিনি এসব বীরদের নিহত করতে গিয়ে একেক প্রকার বৈধ ছলনার আশ্রয় নেন। শ্রীমান কৃষ্ণ জানতেন, পশ্চাৎগমনের মতো কৌশলই অর্জ্জুনকে মহাবীর কর্ণ বধে সফলতা দিবে। শেষাবধি কুরুক্ষেত্রে শ্রীমান কৃষ্ণ অন্যান্য মার্গ প্রদর্শনের মতো একাগ্রভক্তকে পশ্চাৎগমনের মার্গও প্রদর্শন করান।…

কবিতায় কথক ধনুকের পিছনে বেঁকে যাওয়ার সাথে নিজের পিছানোর সাদৃশ্য অনুভব করলেও অর্জ্জুনের পশ্চাৎগমনের সাথে নিজের পিছানোর সাদৃশ্য অনুভব করেননি। অর্জ্জুনের পশ্চাৎগমনের উদ্দেশ্য ছিলো কর্ণ বধ। পক্ষান্তরে কথকের পিছানোতে আছে মহাবীর কর্ণের প্রতি সহমর্মিতা, সমবেদনা। এটা স্পষ্ট যে, কৃষ্ণার্জ্জুন নয় বরং সূতপুত্র হওয়ার দরুন লাঞ্চিত বঞ্চিত বিক্ষুব্দ বীর কর্ণের প্রতিই কথকের পক্ষপাত।... এখানে মহাভারতের কুরুক্ষেত্রকে পৃথিবীর কুরুক্ষেত্ররূপে বর্ণনা করায় পৌরাণিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ মহাকালীন ব্যাপ্তি পেয়েছে। একটু গভীরভাবে ভাবলেই বুঝা যাবে, যুগ যুগ ধরে স্বার্থ ও আদর্শের নামে পৃথিবীর মানুষগুলো দুটি প্রধান পক্ষে বিভক্ত হয়ে কুরুক্ষেত্রে নামছে এবং তাতে কর্ত্তৃত্ববাদীদের কেউ কর্ণের মতো তৃতীয় বিশ্বের শক্তিকে স্বীকৃতির নামে নিজের পক্ষে ব্যবহার করছে। আবার কেউ নানা বৈধ ছলনার আশ্রয় নিয়ে সে শক্তিকে বধ করছে। প্রথম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এমন চিত্র হরহামেশাই দেখছে বিশ্ববাসী।

তাই কর্ত্তৃত্ববাদীদের ভুমিকায় কথক এখানে সন্দিহান।…

কথক কর্ণের বেদনা জানার জন্য একটু পিছাতে চায়, অন্ত্যজ মাটির কাঁচাসোনায়।… অন্ত্যজ মাটিকে এখানে অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের প্রতীক এবং কাঁচাসোনাকে অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সহজিয়া জীবনের রূপক ভাবা যেতে পারে। ভিন্ন পরিচয় থাকলেও মহাভারতের কর্ণ অন্ত্যজ শ্রেণীরই প্রতিনিধি। সূতপুত্র পরিচয়কে কর্ণ কখনো অগৌরবের মনে করেননি, তার সচেতন আক্ষেপ দ্রোহ ছিলো সূতপুত্রের/অন্ত্যজ শ্রেণীর যুদ্ধবিদ্যা গ্রহণ করা যাবে না— এমন আরোপিত সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে। যে রীতি তৃতীয় বিশ্বের ওপর আজও নিষেধাজ্ঞা হয়ে আছে। যেমন তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা পারমাণবিক কার্য্যক্রমের ওপর আরোপিত শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের নিষেধাজ্ঞা।…

সূতপুত্র হওয়াকে কর্ণ কখনো অগৌরবের মনে করেননি, কিন্তু সূতপুত্র হওয়ার কারণেই সমাজ তাকে দিয়েছে লাঞ্চনা। এখানে কথকের মহাবীর কর্ণের বেদনা জানার মর্ম্ম হয়তো এটাই!— কর্ণের বেদনা অন্ত্যজ মানুষের বেদনা!…

টা ন টা ন/
ধনুকের ছিলাময়/
বুড়ো আঙুলের ইতিহাসে/ মর্ম্মের পোড়নে জেগে ওঠে একলব্যবিশ্ব/…

এটি দারুন উৎসাহ ব্যঞ্জক চরণ।

একদিন কর্ত্তৃত্ববাদী হস্তিনাপুরের স্বার্থের জন্য বিসর্জ্জিত হয়েছিলো প্রতিভাবান ধনুর্বিদ একলব্যের বৃদ্ধ্বাঙ্গুলি— তৎকালীন আর্য্যাবর্তের ক্ষমতা কেন্দ্র'র সূতিকাগার ছিলো হস্তিনাপুর। যে হস্তিনাপুর'কে সুরক্ষা দিতে মানসশিষ্য একলব্য'র বুড়ো আঙ্গুল কেটে নিয়েছিলো গুরু(!) দ্রোনাচার্য্য(ড্রোনাচার্য্য> ড্রোন আচার্য্য?!...)। ভয় ছিলো, নিষাদপুত্র একলব্য'র ধনুকের তীর একদিন ধেয়ে ধেয়ে আসবে হস্তিনাপুরের ক্ষমতা কেন্দ্রের কাঠামোর দিকে।... কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্নতা পেয়েছে। টান টান ধনুকের ছিলাময় বুড়ো আঙুলের ইতিহাসে হস্তিনাপুরের স্বার্থের কাছে বলি হওয়া ব্যাধ রাজ্যের মতো অবহেলিত তৃতীয় বিশ্ব আজ জেগে ওঠছে। কর্ত্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের প্রতি তারা আজ ভক্তিমূলক সমর্থন উঠিয়ে নিচ্ছে। পরাজয় ও উপনিবেশের ইতিহাস আজ একলব্যরূপী তৃতীয় বিশ্বকে মর্ম্মে মর্ম্মে পোড়াচ্ছে এবং জাগিয়ে তোলছে… ক্ষমতাকেন্দ্রের খুঁটি আজ মধ্যবিন্দু ছেড়ে প্রান্তরের দিকে সরে যাচ্ছে নতুন সৌন্দর্য্যে। গুটিকয় রাষ্ট্রের বিশ্বময় কর্ত্তৃত্ব করার রীতি বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। কর্ত্তৃত্ববাদী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ক্ষমতা লোপ পেতে যাচ্ছে, তাদের একচ্ছত্র কর্ত্তৃত্ববাদী ক্ষমতার বিপরীতে তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কর্ত্তৃত্বের অধিকার আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠছে। বিশ্বে একক কেন্দ্রের শাসন লোপ পেতে যাচ্ছে। প্রান্তের মানুষগুলি এখন নিজেদের শক্তির প্রতি আস্থাবান হয়ে ওঠছে।…

প্রাসাদের ভারবহ/ ক্ষমতা কেন্দ্রের খুঁটি/ মধ্যবিন্দু ছেড়ে/ নতুন সৌন্দর্য্যে সরে যায়/ প্রান্তরের দিকে/…

এই চিত্রকল্পটি সেই কথাই ঘোষণা করছে।… প্রাসাদের ভারবহ মধ্যবিন্দুর নতুন সৌন্দর্য্যে প্রান্তরের দিকে সরে যাওয়ার ব্যাপারটি মিলতে পারে উত্তর আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার সাথেও। (……)

বাংলা আসাম ও ওড়িষ্যার মতো বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাচ্যের প্রাচীন দার্শনিক খনা’র সম্পর্কে নানান লোকশ্রুতির (প্র)চলন আছে। একটি লোকশ্রুতি মতে, প্রতাপাধিত্যের সভাপণ্ডিত পুরুষতন্ত্রের (প্রতি)নিধি কর্ত্তৃত্ববাদী বরাহ নারীর প্রতিভা ও চর্চ্চায় ইর্ষান্বিত হয়ে পুত্র মিহিরের সহায়তায় কেটে দেয় পুত্রবধু খনার জিহ্বা। কর্ত্তৃত্ববাদী পুরুষতন্ত্রের এমন ঘৃণিত পদক্ষেপ সত্ত্বেও খনা’র বচন ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। কথার মালায় রচা বিনিসুঁতো মালারূপী খনা’র বচনগুলো হয়ে ওঠে অবিসংবাদীত কৃষিবিজ্ঞান/কৃষিবিধান… এ অঞ্চলে খনা সম্পর্কিত প্রায় সব লোকশ্রুতিই গড়ে ওঠেছে প্রান্তিক/লোকজ মেজাজে। তাই মিহিরের স্ত্রী হোক, দার্শনিক ঋষি অটনাচার্য্য'র কন্যা হোক, রাজকুমারি হোক কিংবা রাক্ষসকন্যা— যাই হোক না কেনো, সর্ব্বত্রই সাধারণ মানুষ খনাকে নিজেদের বলে গ্রহণ করেছে। খনা’র বচন যেভাবে প্রান্তিক কৃষিসমাজকে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে নিয়েছে তেমনি বচনগুলি আবার হয়ে ওঠেছে প্রান্তিক মানুষের (উদ্)যাপনের  কথামালা।…

মুক্তক অক্ষরবৃত্তে রচিত ‘(উদ্)যাপনের কথামালা’য় পর্ব্ববিভাগ দেখানো হয়েছে (/) বিকল্পচিহ্নের মাধ্যমে। এই অভিনব রীতিকে একধরণের আঙ্গিক প্রতিকাব্যরীতি ভাবা যেতে পারে। মধ্যযুগীয় বাংলাকাব্য ও পুঁথি সাহিত্যে পদ-পর্ব্বান্তে এবং চরণান্তে তারকা চিহ্ন কিংবা দুই দাঁড়ির ব্যবহার হয়েছে। আধুনিক কবিদেরও কেউ কেউ দুই দাঁড়ির ব্যবহার করেছেন। আবার একেবারে ছেদ যতিচিহ্নহীন টেক্সটও লিখেছেন। কেউ কেউ হাইফেন ও ড্যাস চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এভাবে ছেদ অর্দ্ধযতি পূর্ণযতির পরিবর্তে সর্ব্বত্র বিকল্প চিহ্নের ব্যবহার আগে কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না।

‘(উদ্)যাপনের কথামালা’য় মোট পর্ব্ব সংখ্যা ঊনত্রিশ, মোট পংক্তি বিশ, মোট চরণ সংখ্যা পাঁচ। প্রথম পর্ব্বটি আট মাত্রার আর সর্ব্বশেষ পর্ব্বটি দশমাত্রার। সর্ব্বনিম্ন চার থেকে ছয় আট দশ এগার ও সর্বোচ্চ ষোল মাত্রার পর্ব্ব ব্যবহৃত হয়েছে। অনেক সময় একমাত্র শব্দ একটি পর্ব্ব ও পংক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রত্যেক চরণ আলাদা আলাদা ভাব সম্বলিত এবং পূর্ব্ব চরণের সাথে পরের চরণের গভীর ভাবগত তাৎপর্য্যময় সম্পর্ক থাকায় সম্পূর্ণ কবিতায় কোথাও ভাবের প্রবাহমানতা লঙ্ঘিত হয়নি। সরল প্রাঞ্জল ভাষা ব্যবহারের ফলে ভাব-প্রবাহমানতার সাথে সাথে আশ্চর্য্যজনকভাবে সুরের প্রবাহমানতাও গড়ে ওঠেছে। পরাণ, কৃষ্ণকালা, পোড়ন, বিনিসুঁতো প্রভৃতি লোকজ শব্দের ব্যবহার কোমল সুর মাধুর্য্য সৃষ্টির সহায়ক হয়েছে।…

পরাণ কথার নীড়, অন্ত্যজ মাটির কাঁচাসোনা, বুড়ো আঙুলের ইতিহাস, একলব্যবিশ্ব, ক্ষমতা কেন্দ্রের খুঁটি, বিনিসুঁতো মালা প্রভৃতি প্রতীক ও রূপক কবিতাটিকে দারুণ ব্যঞ্জনাময় করে তোলেছে। পৌরাণিক ঘটনাও কিংবদন্তির ভিত্তিতে রচিত হলেও কবিতায় এসব ঘটনা মহাকালীন ও সমকালীন রাজনৈতিক সমাজ বাস্তবতার তাৎপর্য্য ধারণে সক্ষম। পুরাণ ও কিংবদন্তি এখানে যেমন কবিতার অঙ্গ হয়েছে তেমনি আবার মহাকালীন ও সমকালীন বাস্তবতায়ও একাকার হয়েছে। কর্ণ একলব্য ও খনা যেমন উপেক্ষিত শক্তি তেমনি তারা উপেক্ষিত অন্তজ্য শ্রেণীর (প্রতি)নিধিও।...

কবিতায় কর্ণ, একলব্য ও খনার প্রতি সহমর্মিতা ও সমবেদনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে চিরকালের অবহেলিত লাঞ্চিত প্রান্তিক জনসমাজেকে জাগরণের প্রেরণাও দেওয়া হয়েছে। এখানে কর্ত্তৃত্ববাদী কথিত কেন্দ্রীয় শক্তির প্রতি যেমন প্রচ্ছন্ন ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে তেমনি তাদের বিলুপ্তির পূর্বাভাসও ঘোষিত হয়েছে।…

কবিতায় বীররসের পাশাপাশি রুদ্র ও করুণ রসের অবস্থান থাকলেও শেষপর্যন্ত বীররসই প্রকট হয়েছে। তাই ‘(উদ্)যাপনের কথামালা’ প্রান্তিক মানুষের জাগরণের চিত্র লালিত আগামী বিশ্বের (উদ্)যাপনের কথামালা……………